ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

টাঙ্গুয়ার হাওর

প্লাস্টিকের চাঁই নির্মূলে পদক্ষেপ নেই ভুগছে হাওর ও দরিদ্র জেলেরা

প্লাস্টিকের চাঁই নির্মূলে পদক্ষেপ নেই ভুগছে হাওর ও দরিদ্র জেলেরা
×

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্লাস্টিকের চাঁই নিয়ে মাছ শিকারে নেমেছেন স্থানীয় দুই জেলে। গত মঙ্গলবার তোলা ছবি সমকাল

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়, সীমান্তবর্তী মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রকৃতি ও প্রতিবেশ। চলতি মৌসুমে আগাম বৃষ্টির মাত্রা বেশি থাকায় এরই মধ্যে পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভরে উঠেছে স্থানীয় নদীগুলো। হাওরে ঢুকতে শুরু করেছে নতুন পানি।

প্রতিবছর নদী হয়ে হাওরে প্রবেশ করা এই নতুন পানির সঙ্গে আসে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। সেই মাছ শিকারের জন্য হাওরজুড়ে স্থানীয় জেলেরা নেমে পড়েন প্লাস্টিকের চাঁই হাতে। হাওরের পরিবেশ ধ্বংসকারী এই যন্ত্রের ব্যবহার দৃশ্যমান হলেই শুরু হয় নানা তৎপরতা ও সমালোচনা। 
তবে এসব চাঁই প্রস্তুত, মজুত ও বিক্রি বন্ধে নিয়মিত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না প্রশাসনকে। যার কারণে টাঙ্গুয়ার হাওরের সর্বত্র প্লাস্টিকের চাঁই (মাছ ধরার বিশেষ যন্ত্র) দিয়ে চলছে অবাধে মাছ শিকার। তবে কোথা থেকে আসছে এই প্লাস্টিকের চাঁই; কারাই বা বিক্রি করছে– হদিস নেই কারও কাছে।
এ বছর চেরাপুঞ্জিতে প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে যাদুকাটা ও পাটলাই নদীর পানি বেড়ে হাওরে আগাম পানি প্রবেশ করেছে। এ সুযোগে স্থানীয় জেলেরা প্লাস্টিকের চাঁই দিয়ে অবাধে মাছ শিকারে নেমে পড়েছে। এসব চাঁইয়ে চিংড়িসহ নানা ধরনের ছোট ছোট মাছ ধরা যায় বলে দিন দিন এর ব্যবহার বাড়ছে। তা ছাড়া ক্ষতিকর এ যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধে প্রশাসনের তেমন তৎপরতা না থাকায় সে সুযোগটি নিচ্ছে অনেক জেলে।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার (পোহাস) সাধারণ সম্পাদক পীযূষ পুরকায়স্থ টিটু বলেন, প্লাস্টিকের চাঁইয়ের ব্যবহার রোধ করতে না পারলে টাঙ্গুয়ার হাওরসহ অন্যান্য হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আরও হুমকির মুখে পড়বে। এগুলোর ব্যবহার রোধে হাওরবাসীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরিবেশ বিধ্বংসী এসব প্লাস্টিক চাঁই জেলা শহর থেকে মিনি পিকআপ অথবা অটোরিকশায় তাহিরপুর উপজেলা সদর হয়ে নৌকাযোগে জেলেরা টাঙ্গুয়ার হাওরে নিয়ে যায়।
তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার, শনির, মহালিয়া, মাটিয়ান, বনুয়ার, সমসার ও এরালিয়ার কোনা হাওর ঘুরে দেখা গেছে এ উপজেলার পাঠাবুকা, সুলেমানপুর, লামাগাঁও, মানিকখিলা, রামসিংহপুর, জয়পুর গোলাবাড়ী, মন্দিয়াতা, ইন্দ্রপুর, বিনোদপুর, পানিয়াখালী, তেরঘর, কলাগাঁও, নবাবপুর, জামালপুর, শিবরামপুর, বেতাগড়া; মধ্যনগর উপজেলার রূপনগর, বাকাতলা, ইছামারী, রাজেন্দপুর, রংচি,আমানিপুর, নিশিন্ত বংশীকুন্ডা, সানুয়া, কাউহানী, খিদিরপুর, হাতপাটন গ্রামে জেলেরা মাছ ধরতে এসব চাঁই ব্যবহার করছে।
পানির নিচে সারিবদ্ধভাবে সুতা দিয়ে বেঁধে ময়দার টোপ অথবা শামুক দিয়ে এসব প্লাস্টিকের চাঁই রেখে দেওয়া হয়। সকালে এসব চাঁই তুলে এর ভেতর থেকে চিংড়ি ও ছোট মাছ বের করা হয়। চাঁইগুলো নষ্ট হয়ে গেলে সেগুলো আবার পানিতেই ফেলে দেওয়া হয়।

টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের গোলাবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা খসরুল আলম বলেন, চাঁইগুলো প্লাস্টিকের হওয়ায় এগুলো অপচনশীল। এসব চাঁই পানিতে ফেলে দেওয়ায় তাতে হাওরের জলচর প্রাণীসহ মাছের ক্ষতি হচ্ছে। তা ছাড়া এগুলোতে ছোট ছোট মাছ আটকে যাচ্ছে। এতে মাছের বংশবৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়ছে।
লামাগাঁও গ্রামের কয়েস মিয়া বলেন, প্লাস্টিক মুড়িয়ে বাঁশের কঞ্চি ও তার দিয়ে তৈরি করা হয় গোলাকার চাঁই। ১০-১২ বছর আগে শুধু বাঁশের তৈরি চাঁই দিয়েই চিংড়ি মাছ ধরা হতো। খরচ স্বল্প এবং বারবার ব্যবহার করা যায় বিধায় প্লাস্টিকের চাঁইয়ের চাহিদা বেড়েছে।
খুলনা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক আহসান হাবিব বলেন, প্লাস্টিক চাঁইয়ের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এই হাওর। তাই সময় থাকতেই প্রশাসনকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এবং মৎস্য সম্পদ রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর হাওরে যারা প্লাস্টিক চাঁই দিয়ে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 

আরও পড়ুন

×