রাইসার মতো পরিণতি যেন আর কারও না হয়—আক্ষেপ বাবার
শিশু রাইসা। ছবি: সংগৃহীত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ২১:৪৩
পাঁচ মাসের রাইসা তাবাসসুম ছিল তার বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। মা ডাকার চেষ্টা, মায়াবী চাহনি আর ফুটফুটে হাঁসি এবং মায়াভরা মুখ দেখে বাড়ির সবার সময় কেটে যেত আনন্দে। ছোট বোনকে নিয়ে খেলার নেশায় জোর করে পাঠাতে হতো সাত বছর বয়সী বড় সন্তান হুমাইরা আফিয়ার। বড় মেয়ে স্কুলে যাবার পর সংসারের কাজের পাশাপাশি সময় কেটে যেত রাইসাকে নিয়ে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের বড় ইন্দারা মোড়ের কালিতলা মহল্লায় ২১ মার্চ ঈদের দিন সবাই যখন আনন্দ করার জন্য ব্যস্ত ছিল ঠিক সে সময় পরিবারটির উপর নেমে আসে আতঙ্ক।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ জন থাকলেও মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে বাড়তে থাকে হু হু করে। পরিস্থিতি সামলাতে ১২ বেডের শিশু ওয়ার্ড থেকে হামে আক্রান্তদের আলাদা করে কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টারকে অস্থায়ীভাবে হামে আক্রান্তদের জন্য আইসোলেশন সেন্টার ঘোষণা দিয়ে চিকিৎসা আরম্ভ করা হয়।
আর ঠিক এ সময় আদরের ছোট সন্তানটির শরীরে হালকা জ্বর আর রেশ দেখা দেওয়ায় এত আতঙ্ক। আতঙ্কিত বাবা-মা ঈদের নামাজ ও সব আনন্দ বাদ দিয়ে সাত বছর বয়সী বড় সন্তানকে ঘরবন্দি করে ছুটে যান হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতালে সেদিন সময় মত পাননি ডাক্তার ও নার্স। যারা ছিল তাদের কেউ স্যালাইন করার জন্য ক্যানোলা লাগানোর সাহস দেখায়নি। হতভাগ্য বাবা মাসুদ রানা মেয়েকে বাঁচাতে বাইরে থেকে দ্রুত একজন নার্সকে নিয়ে এসে ক্যানোলা এবং স্যালাইন লাগানোর ব্যবস্থা করেন। হাসপাতালে ভর্তিও পরও বাইরের ডাক্তারের কাছে নেন চিকিৎসাপত্র। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পরও শিশুটির অবস্থা অবনতি এবং একপর্যায়ে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে ভর্তি দু’দিনের মাথায় কর্তব্যরত ডাক্তার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন। বাবা শহরের একটি রেস্টোরেন্টে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতনের ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করায় ডাক্তারের সে পরামর্শ অগ্রাহ্য করে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার ১২ দিনের মাথায় অর্থের ব্যবস্থা করেন এবং বেতনের টাকা নিয়ে রাজশাহী মেডিকেলে যান। ভর্তির ৩ দিনের মাথায় আইসিইউ পেয়ে সন্তান একটু সুস্থ হলে ১২ এপ্রিল সাধারণ ওর্য়াডে স্থানান্তর করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পরদিন থেকে অবস্থার অবনতি হলেও আর আইসিইউ মেলেনি। ২৪ এপ্রিল ছোট কন্যা সন্তানটিকে হারান শিশুটির বাবা-মা।
হাসপাতালের বারান্দায় বসে রাইসার মা ফাতেমা বেগম বারবার বলছিলেন, ‘আমার বুকের ধনটিকে একটু দেখেন, ও তো আমার সঙ্গে কথা বলছে না।’ কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ডাক্তার ঘোষণা দিলেন তার বুকের ধন আর নেই। শোকে স্তব্ধ বাবা-মায়ের ওপর তখন চলছিল মৃত সন্তানকে বাড়ি নিয়ে যাবার চ্যালেঞ্জ। লাশবাহী গাড়ির সিন্ডিকেটের কাছে হার মানে রাইসা হারানোর মানবতা। ১২ হাজার টাকায় বাধ্য হয়ে গাড়ি ভাড়া নিয়ে সন্তানকে নিয়ে ফেরেন তারা। এরপরই একটা র্দীঘশ্বাস ফেলে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলেন রাইসার মা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানালেন, এখন বড় সন্তানটি স্কুল যাবার পর হারানো সন্তানের ছবি দেখে সময় কাটে তার। মনের অজান্তে কান্নায় বুক ভাষান তিনি।
তিনি জানান, সকালে নাস্তা করে বের হন মাসুদ রানা। সারা দিন ব্যস্ত থাকেন। ফেরেন সন্ধ্যায়।
শহরের সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হুমাইরা আফিয়া জানায়, তার বোন রাজশাহী থেকে আসার পর আকাশের তারা হয়ে গেছে। ৩ বছর পর একটা বোন পেয়ে ভালো লাগলেও এখন তার আর কোনো খেলার সাথি রইল না।
সন্ধ্যায় বাড়ি গিয়ে মাসুদ রানার সঙ্গে মেয়ের মৃত্যু নিয়ে কথা বলতেই ক্ষোভ জানান তিনি। বলেন, হাসপাতালে বেড, নেই নার্স। ছুটির দিনে তাদের কাউকে পাওয়া যায় না। যারা থাকে তারাও খারাপ ব্যবহার করেন। এসব নিয়ে লিখতে পারবেন? পারলে ওইসব নিয়ে লেখেন। আপনার সংবাদে তো আর আমার সন্তান ফিরবে না। তবে আপনাদের সংবাদে চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত এবং অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়ির সিন্ডিকেট যদি ভাঙে তবেই আমি খুশি হব।
কয়েক মিনিট নীরব থাকার পর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একটায় তার মন্তব্য, আমার মেয়ের মতো যেন আর কারও পরিণতি না হয়। কোনো বাবা-মায়ের কোল খালি যেন না হয়।
বাড়ির পাশের এক প্রতিবেশী ইসাহাক আলি জানান, পৈতৃক সূত্রে দেড় কাঠা জমি পেয়ে সেখানেই মাথা গেঁজায় ঠাঁই করেন মাসুদ রানা। অল্প বেতনে চলে যেত তাদের সংসার। ১৫ বছর আগে মাসুদের বিয়ে হয়। ৫ বছরের মাথায় প্রথম কন্যা সন্তান হলে আর্থিক অনটনের কারণে দ্বিতীয় সন্তান নেন ৮ বছরের মাথায়।
বেতন ও ধার করা টাকায় অনেক আশা নিয়ে রাইসাকে বাঁচানোর চেষ্টা ছিল মাসুদের। এক হামে সব শেষ হয়ে গেল পরিবারটির।
প্রসঙ্গত, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে গত ৩ মাসে হামের উপসর্গে ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়াদের বেশিরভাগই চাঁপাইনবাবগঞ্জের।
- বিষয় :
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ
