ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

১৫ বছরে ৭ ভিসি, চারজনেরই অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায়

নতুন ভিসিকে ঘিরেও শুরুতেই বিরোধিতার আভাস

১৫ বছরে ৭ ভিসি, চারজনেরই অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায়
×

বাঁ থেকে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম, অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন, অধ্যাপক ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়া ও অধ্যাপক ড. এস এম ইমামুল হক। ছবি: সংগৃহীত

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ২১:৪৫

চার বছরের জন্য উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের বিধান থাকলেও ১৫ বছরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) সাতজন ভিসি দায়িত্ব পেয়েছেন। এর মধ্যে চারজনকেই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। গত এক বছরের মধ্যেই তিনজন উপাচার্যকে পদ ছাড়তে হয়েছে। সর্বশেষ শুক্রবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়টির সপ্তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিদায় নেওয়া চার উপাচার্যের মধ্যে তিনজনই শিক্ষার্থী আন্দোলনের মুখে পড়েছিলেন। সর্বশেষ উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে বিদায় নিতে হয়েছে শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, উপাচার্যদের বিরুদ্ধে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিয়ে নিজস্ব বলয় তৈরির অভিযোগ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, তাদের ঘনিষ্ঠদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো। এতে বঞ্চিত অংশ সুযোগের অপেক্ষায় থাকত এবং বিভিন্ন ঘটনায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উসকে দিত।

সদ্য বিদায়ী উপাচার্য ড. তৌফিক আলমের বিরুদ্ধে ৬০ জন শিক্ষকের পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে শিক্ষকরা লাগাতার শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন এবং তাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।

শিক্ষকদের দাবি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী পদোন্নতি দিতে হবে। তবে উপাচার্য বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করেই পদোন্নতি দিতে হবে। গত বছরের ১৫ মে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পান এবং ২৫ সেপ্টেম্বর পূর্ণকালীন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। সব মিলিয়ে প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

নতুন উপাচার্যকে ঘিরেও বিরোধিতা
নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ এর আগে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিন ছিলেন। তিনি বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর পবিপ্রবি ইউনিটের সভাপতি। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি ববির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।

শুক্রবার বিকেলে ক্যাম্পাসে পৌঁছালে শিক্ষক-কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান। তবে তার আগমনের আগেই একদল শিক্ষার্থী তার অপসারণ দাবিতে বিক্ষোভের ঘোষণা দেয়। ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত পোস্টারে তাকে ‘অযোগ্য ও বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে অপসারণ দাবি করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিক্ষোভের নেপথ্যে ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ইসলামী ছাত্র মজলিসের নেতারা। ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততার গুঞ্জন থাকলেও তাদের প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

অন্যদিকে নতুন উপাচার্যকে স্বাগত জানিয়ে একই সময়ে কর্মসূচি দেয় ববি ছাত্রদল। গ্রাউন্ড ফ্লোরে ছাত্রদলের অবস্থানের কারণে বিরোধী পক্ষ শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভে নামেনি।

ববি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের পর একটি গোষ্ঠী কখনও সাধারণ শিক্ষার্থী, কখনও জনতার ব্যানারে দেশে মব তৈরি করছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও তারা একই চেষ্টা করেছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীরা সাড়া না দেওয়ায় তারা নামতে পারেনি।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ববি শাখার সদস্যসচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা নতুন উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে বিক্ষোভ ডেকেছিল। আমরা এতে সংহতি জানিয়েছি। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় কর্মসূচি হয়নি।’ 

তিনি বলেন, ‘তিনি একটি অনুষদের ডিন ছিলেন। তার পক্ষে ববি সামলানো কঠিন হবে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে চাই।’

যেভাবে বিদায় নিতে হয়েছে চার উপাচার্যকে
ছাত্র আন্দোলনের মুখে প্রথম বিদায় নিতে হয় ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়াকে। ২০২৪ সালের ৪ মার্চ উপাচার্য হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রায় ছয় মাসের মাথায় ২০ আগস্ট তাকে অপসারণ করা হয়। আন্দোলনকারীরা তাকে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ বলে আখ্যা দিয়েছিল।

এরপর একই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর উপাচার্য হন অধ্যাপক ড. শুচিতা শারমিন। আট মাসের মাথায় গত বছরের ১৪ মে তিনিও আন্দোলনের মুখে পদ ছাড়েন। পরদিন অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পান ড. তৌফিক আলম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্য ড. এস এম ইমামুল হক মেয়াদ পূর্ণ করলেও শেষ দিকে ছাত্র আন্দোলনের মুখে কয়েক মাস ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেননি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন প্রায় সবাই। ড. এস এম ইমামুল হক দুঃখ প্রকাশ করেন, ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়া ক্ষমা চান। ড. শুচিতা শারমিন বিদায়ের আগের দিন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ড. তৌফিক আলমও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারও অবস্থান টেকেনি।

আরও পড়ুন

×