ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জন্মের পরই যমজ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর

জন্মের পরই যমজ শিশুর শরীরে  অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর
×

হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে গত ৫ মে শিশু দুটির জন্ম হয় সমকাল

 রাজশাহী ব্যুরো 

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

যমজ সন্তান জন্ম নেওয়ার খবরে পরিবারে বইছিল খুশির জোয়ার। তবে সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। চিকিৎসক জানিয়েছেন, দুই নবজাতকের শরীরে প্রায় সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারিয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে। 

গত ৫ মে রামেক হাসপাতালে নাটোরের লালপুর উপজেলার লক্ষ্মণবাড়িয়া এলাকার মানিক উদ্দিনের স্ত্রী কোহিনুর সুলতানা এই যমজ সন্তানের জন্ম দেন। জন্মের কিছুক্ষণ পরই জানা যায় শিশু দুটির শারীরিক জটিলতা। এখনও তাদের নাম রাখা হয়নি। হাসপাতালের খাতায় তাদের ‘মানিক-১’ ও ‘মানিক-২’ নামে রাখা হয়েছে। 

গত ৫ মে হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে শিশু দুটির জন্ম হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই চিকিৎসকরা জানান, নবজাতকদের অক্সিজেন সঞ্চালন স্বাভাবিক নয়। তাদের ২৬ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। 

বাবা মানিক উদ্দিন জানান, একদিন একরাত সেখানে থাকার পর বাচ্চারা অস্বাভাবিক কান্নাকাটি শুরু করে। এরপর তাদের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের নবজাতক আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তখন থেকেই অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছে।

গত সোমবার শিশু দুটির কয়েকটি পরীক্ষা করানো হয়। এর মধ্যে ছিল কালচার অ্যান্ড সেনসিটিভিটি টেস্ট। গত বৃহস্পতিবার সেই রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, শিশু দুটির শরীরে প্রায় সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট বা অকার্যকর হয়ে গেছে। এরপর থেকেই হতাশায় ভেঙে পড়েছেন বাবা-মা। 

শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসক মোহতারামা মোস্তারী বলেন, মানিক-১ তুলনামূলক ভালো আছে। তবে মানিক-২-এর অবস্থা বেশি জটিল। তার শরীরে অক্সিজেন বেশি লাগছে। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিভাবকদেরও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হচ্ছে। 

তিনি বলেন, সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট নবজাতক এর আগেও আমরা পেয়েছি। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত কলিস্টিন নামের একটি শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহার করা হয়। লক্ষণ বুঝতে পেরে রিপোর্ট পাওয়ার পাঁচ দিন আগেই তাদের ওই ওষুধ দেওয়া শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার রিপোর্ট আসার পর দেখা যায় আমাদের আশঙ্কাই সত্য হয়েছে। 

জনস্বাস্থ্যের এক ভয়াবহ সংকট 
নবজাতকের শরীরে কেন ওষুধ কাজ করছে না, তার ব্যাখ্যা দিলেন রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. বেলাল উদ্দিন। তাঁর মতে, এটি দেশের জনস্বাস্থ্যের এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সংকেত। 

তিনি বলেন, দেশে নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণেই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক সময় রোগের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। আবার সঠিক ডোজ ও নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ওষুধ সেবনের বিষয়টি মানা হচ্ছে না। এতে ব্যাকটেরিয়াগুলো ধীরে ধীরে ওষুধের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। যেসব রোগ সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সেরে যাওয়ার কথা, সেখানে দ্রুত ফল পেতে উচ্চমাত্রার ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে পরবর্তী সময়ে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। 

ডা. বেলাল উদ্দিন মনে করেন, নবজাতক দুজন সম্ভবত মায়ের মাধ্যমেই এই ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট’ ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। হয়তো গর্ভাবস্থায় তাদের মা এমন কোনো সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যার জীবাণু আগে থেকেই উচ্চমাত্রার ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছিল। এখন কার শরীরে কোন ওষুধ কার্যকর, তা জানতে কালচার অ্যান্ড সেনসিটিভিটি টেস্ট ছাড়া উপায় নেই বলেও জানান তিনি। 

তবে মা-বাবা থেকে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হতে পারে–এমন দাবি নাকচ করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে। তিনি বলেন, ‘‘হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুর ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গুরুতরভাবে কমে যায়। এ সময় শরীরে কোনো সংক্রমণ দেখা দিলে অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো আর কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না।’’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, হাসপাতালে অবস্থানের সময় নবজাতকদের নানা ধরনের জীবাণুর সংস্পর্শে আসার উচ্চ ঝুঁকি থাকে। 

এই পরিবেশ থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু শিশুদের শরীরে বিস্তার লাভ করার আশঙ্কা বেশি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে হাসপাতালকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত রাখা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা জরুরি। 

চিকিৎসকদের এমন ভিন্নধর্মী মতামতের বিষয়ে রাজধানীর একটি স্বনামধন্য হাসপাতালের আরেকজন নিওন্যাটোলজিস্টের (নবজাতক বিশেষজ্ঞ) সঙ্গে কথা বলে সমকাল। নবজাতকের শরীরে ওষুধ কার্যকর না হওয়ার পেছনে তিনি বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করেন। 

তিনি জানান, জন্মের তিন দিনের মধ্যে যদি অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হওয়ার প্রমাণ মেলে, তবে সেটি মায়ের শরীর থেকে আসা সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। কিন্তু তিন দিন পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বুঝতে হবে সেটি আশপাশের পরিবেশ থেকে আসা সংক্রমণ। এক্ষেত্রে ‘ক্রস ইনফেকশন’ বা অন্য শিশু রোগী থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া ভেন্টিলেটর বা সি-প্যাপ মেশিনের মতো চিকিৎসাসরঞ্জাম থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। 

আরেকটি বড় কারণ হিসেবে তিনি ‘হ্যান্ড হাইজিন’ বা হাত পরিষ্কার রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। চিকিৎসক বা সেবিকাদের হাতের মাধ্যমেও নবজাতকরা সংক্রমিত হতে পারে। পাশাপাশি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অতি উচ্চমাত্রার ওষুধ তৈরির প্রবণতাকেও তিনি দায়ী করেন। তাঁর মতে, নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বিশেষ করে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ এসব উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক যথেচ্ছ ব্যবহার করছে। এটিই পরবর্তীকালে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনছে। 

এদিকে, জন্মের ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও জটিলতার কারণে শিশু দুটি এখনও বাড়ি যেতে পারেনি। সন্তানদের নিয়ে তীব্র উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে মানিক-কোহিনুর দম্পতির। 

আরও পড়ুন

×