ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমঝোতায় হাট ইজারা, খাজনায় নৈরাজ্যে ক্রেতা-বিক্রেতার ক্ষোভ

সমঝোতায় হাট ইজারা, খাজনায় নৈরাজ্যে ক্রেতা-বিক্রেতার ক্ষোভ
×

সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৮:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলাজুড়ে হাট ইজারা দেওয়া নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সমঝোতার মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে অধিকাংশ হাট আগের বছরের তুলনায় কম দামে ইজারা নেওয়া হয়েছে। অথচ ইজারামূল্য কমলেও ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের কয়েকগুণ বেশি খাজনা। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ কৃষক ও ক্রেতা-বিক্রেতাকে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। 

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চারঘাটে মোট ১৬টি হাট রয়েছে। এর মধ্যে ২টি পৌরসভার আওতায় এবং বাকি ১৪টি উপজেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর হাট ইজারায় প্রতিটি হাটে একজনের বেশি দরপত্র জমা পড়েনি। ফলে প্রতিযোগিতা না থাকায় সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন মূল্যে হাট ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। 
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের সমঝোতার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় আলোচনায় রয়েছে উপজেলার বৃহত্তম হাট নন্দনগাছী হাট। এই হাটটি গত বছর ইজারা হয়েছিল ৭৭ লাখ ৬ হাজার টাকায়। অথচ এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৫ লাখ ৬ হাজার টাকায়। একইভাবে গোবিন্দপুর হাট গত বছর ৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকায় ইজারা হলেও এবার হয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকায়।

স্থানীয় কৃষক ও হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতারা অভিযোগ করে বলেন, ইজারার টাকা কমলেও খাজনা আদায়ে কোনো ছাড় নেই; বরং কয়েক গুণ বেশি খাজনা আদায় করা হচ্ছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, হাটের বিভিন্ন স্থানে খাজনার নির্ধারিত মূল্য তালিকা টাঙিয়ে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও উপজেলার কোনো হাটেই এমন কোনো তালিকা টাঙানো হয়নি।
চারঘাটের সবচেয়ে বড় ও একমাত্র পশুর হাট নন্দনগাছী হাট। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একটি ছাগলের জন্য শুধু ক্রেতার কাছ থেকে ২০০ টাকা খাজনা আদায়ের বিধান রয়েছে। গতকাল শুক্রবার ও গত সোমবার এই হাটে গিয়ে দেখা যায়, এই হাটে ইজারাদার ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে আদায় করছেন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ সরকারি নির্ধারিত হারের তিন থেকে চারগুণ বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। একই অবস্থা গোবিন্দপুর হাটেও। 

নন্দনগাছী হাটে ছাগল কিনতে আসা কালাবীপাড়া গ্রামের আব্বাস আলী বলেন, আমি ১১ হাজার টাকা দিয়ে ছাগলের বাচ্চা কিনলাম, এতে লেখানোর খরচ ৫০০ টাকা। বিক্রেতাকেও দিতে হয়েছে ১০০ টাকা। পাশের উপজেলার চন্ডিপুর কিংবা মনিগ্রাম হাঁটে ২০০ টাকা ইজারা থাকলেও আমাদের এখানে তিনগুণ বেশি।
ছাগল ক্রেতা মেরামতপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ইজারাদার খাজনার কাগজে ফি এর জায়গাটা ফাঁকা রেখেছে। ৬০০ টাকা দিয়েছি, কিন্তু কাগজে লিখে নিতে চাইলে চড়াও হয় ইজারাদারের লোকজন। গত বছর ছাগল কিনতে এসে হেনস্তার শিকার হয়েছি। এজন্য এবার চুপচাপ টাকা দিয়ে চলে এসেছি।’
স্থানীয় কৃষক মোজাহেদুল ইসলাম বলেন, বাড়িতে পোষা ছাগল বিক্রি করতে এসেও খাজনা দিতে হচ্ছে। শুনেছি ছাগল বিক্রেতাকে খাজনা দিতে হয় না। বাড়ির সবজি বিক্রি করতে এলেও অতিরিক্ত খাজনা লাগছে। বাজারে সরকারি কোনো মূল্য তালিকা টাঙানো না থাকায় যা খুশি তাই আদায় করছে। 

উপজেলার সদরের চারঘাট পৌর হাট, সরদহ হাট ও বাঁকড়া হাটেও একই অবস্থা। কাগজে কলমে একজন ইজারাদার থাকলেও বেশি টাকা দিয়ে সাব-ইজারার মাধ্যমে হাটের খাজনা আদায় করছেন অন্যরা। স্থানীয়দের মতে, হাট ইজারায় প্রতিযোগিতা না থাকা এবং একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। এতে যেমন সরকারের রাজস্ব কমে যাচ্ছে, তেমনি বাজার ব্যবস্থাও অস্বচ্ছ হয়ে পড়ছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চারঘাট উপজেলার সাধারণ সম্পাদক সজীব ইসলাম বলেন, ‘যদি হাটগুলো কম মূল্যে ইজারা হয়ে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের প্রয়োজন কেন? এতে বোঝা যায়, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট হাট নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনের তদারকি দুর্বল হওয়ায় সাধারণ মানুষ শোষণের শিকার হচ্ছে।’
নন্দনগাছী হাটের ইজারাদার রাজিব আলী মোবাইল ফোনে সমকালকে বলেন, ‘গতবারের চেয়ে কম টাকায় হাট ইজারা নিয়েছি এটা ঠিক। কিন্তু একটা হাট চালাতে অনেক টাকা খরচ হয়। এজন্য হয়তো কিছুটা বেশি নেওয়া হচ্ছে। আপনি আসেন, বিষয়টি বুঝিয়ে বলব।’ 
চারঘাটের ভারপ্রাপ্ত ইউএনও মো. রাহাতুল করিম মিজান বলেন, হাটে অতিরিক্ত খাজনা আদায় বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিগগিরই প্রতিটি হাটে সরকারি নির্ধারিত খাজনার তালিকা টাঙানো হবে।

আরও পড়ুন

×