ফাঁদ পেতে হাতি হত্যার চেষ্টা, সতর্ক করে বনবিভাগের মাইকিং
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ২০:৪৫
গত এক মাসের বেশি সময় খাবারের সন্ধানে জঙ্গল থেকে লোকালয়ে নেমে এসেছে এক পাল হাতি। তারা ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ের বড়গজনী, ছোট গজনী, তাওয়াকুচা, বাকাকুড়া, সন্ধ্যাকুড়া শ্রীবরদীর বালিঝুরি, কর্ণঝোড়া, মেঘাদল ও নালিতাবাড়ীর মধুটিলা, বারোমারী, বুরুঙ্গা, কালাপানি, সমেস্চুড়া, বাতকুচি, কোচপাড়া, হাতিপাগার এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ধানের ক্ষেত, বসতবাড়ি এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এলাকায় হানা দিচ্ছে। এমনকি দিনের বেলায় সীমান্ত সড়কে অবস্থান নিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় কৃষকরা হাতির হাত থেকে স্বপ্নের ফসল বাঁচাতে মশাল জ্বালিয়ে, পটকা ফুটিয়ে, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই ক্ষুধার্ত হাতিকে বশে আনা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে বেশ কিছু জায়গায় হাতি রুখতে কেউ কেউ বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে বনবিভাগ।
এদিকে, হাতিকে নিয়ে ভিডিও করতে অসংখ্য কনটেন্ট ক্রিয়েটর প্রায় প্রতিদিন পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে নানাভাবে তাদের উত্ত্যক্ত করছেন। এতে হাতি আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে আক্রমণ করছে লোকালয়ের বাড়ি-ঘর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ময়মনসিংহ বনবিভাগের উদ্যোগে গত দু’দিন ধরে ( শুক্র ও শনিবার) গারো পাহাড়ের ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে। প্রচারণায় বলা হচ্ছে, শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ী বনাঞ্চল হাতির নিরাপদ আবাসস্থল। তাই, পাহাড়ী বনাঞ্চল, ফসলের জমিতে কিংবা হাতির বিচরণ ক্ষেত্রে, চলাচলের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি, বৈদ্যুতিক তার ও জেনারেটর শকের মাধ্যমে কিংবা দেশি-বিদেশী অস্ত্র দ্বারা বা অন্য কোন উপায়ে হাতি হত্যা বা আহত করা আইনত জামিন অযোগ্য দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি হাতি হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকেন, গোপনে অথবা প্রকাশ্যে প্ররোচনা প্রদান করে; তা প্রমাণিত হলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০২৬ অনুযায়ী তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা, একই অপরাধ আবার করলে সর্বোচ্চ শাস্তি ১২ বছর কারাদণ্ড ও ১২ লাখ টাকা জরিমানা।
প্রচারণায় কৃষক ও স্থানীয়দের আশ্বস্ত করে আরও বলা হয়, বন্যহাতি দ্বারা কারও ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হলে, কোনো মানুষ আহত কিংবা প্রাণহানি ঘটলে বনবিভাগ ক্ষতিপূরণ বিধিমালা অনুযায়ী তদন্ত সাপেক্ষে ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে। তাই, লোকালয়ে বন্যহাতি আসলে দ্রুত নিকটস্থ বনবিভাগ অথবা ইআরটি টিমের সদস্যদের খবর দিন। এবং হাতিকে উত্ত্যক্ত না করে নিরাপদে বনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দিন এবং কারও বাড়ি বা ফসলি ক্ষেতের আশপাশে কোনো বৈদ্যুতিক ফাঁদ থাকলে তা জরুরিভিত্তিতে অপসারণ করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তা না হলে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের হুঁশিয়ারি করে বলা হয়, তারা বন্য হাতির পালকে উত্ত্যক্ত করে ভিডিও তৈরি করলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কথা হয়, গারোপাহাড়ের পশুপ্রেমিক কাঞ্চন মারাকের সঙ্গে। তিনি বনবিভাগের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, সতর্কতামূলক প্রচারনাটি শুভ উদ্যোগ। কারণ, অতীতে এসময়ে হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্বে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষুধার্ত হাতিকে প্রতিহত করতে অনেকে ফাঁদ পেতে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এতে হাতির পাশাপাশি মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে আছে। তিনি বলেন, বনে হাতির খাবারের সংকট। তাই, তাদের আবাসস্থলের কাছে ফসলের ক্ষেত থাকায় তারা লোকালয়ে চলে আসছে।
মধুটিলার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাকের ভাষ্য, কনটেন্ট ক্রিয়েটররা হাতিকে ভীষণ উত্ত্যক্ত করছে। এরা ভিডিও করার জন্য হাতিকে যন্ত্রণা দেয়। হাতি এদের দেখলেই লোকালয়ে চলে আসে। তাই, এদের ব্যাপারে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
রাংটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, অভিযোগ এসেছে বেশ কিছু জায়গায় ফাঁদ পাতা হয়েছে। আমরা অনেক ফাঁদ ইতোপূর্বে ভেঙে ফেলেছি। তাই, সবাইকে সতর্ক করার জন্য দু’দিন ধরে মাইকিং করা হচ্ছে। এরপরও যদি কেউ কর্ণপাত না করেন তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- শেরপুর
