ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সংসার সামলে ছেলের সঙ্গে পরীক্ষায়

সংসার সামলে ছেলের সঙ্গে পরীক্ষায়
×

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে লালপুর উপজেলার মধুবাড়ি দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নেন ফুলঝুড়ি বেগম ও তাঁর ছেলে মনিরুজ্জামান। ছবি: সমকাল

লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ | ১১:১৫

ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল ফুলঝুড়ি বেগমের। অভাব-অনটন আর পারিবারিক বাস্তবতায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালেই ১৯৯৭ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৯ বছর। সংসার, সন্তান আর জীবনসংগ্রামের ব্যস্ততায় বই-খাতা থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছিল তাঁকে।

তবে মনের ভেতরের স্বপ্নটা কখনও হারিয়ে যায়নি। সেই স্বপ্নের হাত ধরেই এবার ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ৪২ বছর বয়সী এই গৃহিণী। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নাটোরের লালপুর উপজেলার মধুবাড়ি দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। তিনি উপজেলার মোহরকায়া নতুনপাড়া মাধ্যমিক কারিগরি ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার ট্রেডের শিক্ষার্থী। একই ট্রেড থেকে তাঁর ছেলে মনিরুজ্জামানও এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে মা-ছেলেকে একসঙ্গে দেখে অনেক পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বিস্ময় প্রকাশ করেন।

ফুলঝুড়ি বেগম উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামের ভ্যানচালক নজরুল ইসলামের স্ত্রী। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। বড় মেয়ে রোজিনা আক্তার মুন্নি নার্সিং শেষ করে ঢাকার একটি ক্লিনিকে চাকরি করছেন। ছোট ছেলে মনিরুজ্জামান এবার মায়ের সঙ্গে একই কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছেন।

ফুলঝুড়ি বেগম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা করতে খুব ভালো লাগত। কিন্তু অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আর পড়া চালিয়ে যেতে পারিনি। সংসার আর সন্তানদের মানুষ করতেই জীবন কেটে গেছে।’ তিনি জানান, বড় মেয়েকে নার্সিং পড়ানোর পর ছেলের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে আবারও নিজের ভেতরে পড়ালেখার ইচ্ছা জেগে ওঠে। পরিবারের উৎসাহেই কয়েক বছর আগে ছেলের সঙ্গে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি।

ফুলঝুড়ি বেগম বলেন, ‘ছেলের পাশে বসে পড়তে পড়তেই সাহস পেয়েছি। এখন ছেলের সঙ্গে পরীক্ষা দিতে পারছি–এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। আমি বুঝেছি, পড়াশোনার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়।’ ভবিষ্যতে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও জানান তিনি। বলেন, ‘এসএসসি পাস করে আরও পড়তে চাই। শিক্ষিত মানুষ হিসেবে সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াতে চাই। সন্তানদেরও সেই শিক্ষাই দিচ্ছি।’

ছেলে মনিরুজ্জামান বলে, ‘আমার মা শুধু মা নন, তিনি আমার সহপাঠীও। আমরা একসঙ্গে পড়েছি, এখন একসঙ্গে পরীক্ষা দিচ্ছি। এটা আমার জন্য অনেক গর্বের বিষয়।’

স্বামী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ভ্যান চালানোর পাশাপাশি গরু-ছাগল পালন করে সংসার চালাই। অভাব আছে, কিন্তু স্ত্রীকে পড়াশোনা করতে কখনও বাধা দিইনি। সে যত দূর পড়তে চায়, আমি সহযোগিতা করব।’

মোহরকায়া নতুনপাড়া মাধ্যমিক কারিগরি ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক মো. তাহানুর ইসলাম বলেন, ‘ইচ্ছাশক্তি থাকলে শিক্ষার পথে বয়স কোনো বাধা নয়। ফুলঝুড়ি বেগম সমাজের অনেক মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।’

ইউএনও মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, ‘ফুলঝুড়ি বেগম সারাদেশের নারী শিক্ষার জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর পড়াশোনায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’

আরও পড়ুন

×