বোয়ালমারীতে খাল খননের সুযোগে বনায়নের গাছ লুট
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
খাল খননের সুযোগে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে সামাজিক বনায়নের কয়েকশ গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার গুনবহা ইউনিয়নে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে এমন কর্মকাণ্ড। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গুনবহা ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ও তাঁর লোকজনই গাছ কাটায় জড়িত। তবে গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে এসব অস্বীকার করেছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ফরিদপুর বন বিভাগের উদ্যোগে গুনবহা ইউনিয়নের তালতলা থেকে ভেন্নাতলা বাজার পর্যন্ত সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১০ হাজার গাছ রোপণ করা হয়। দীর্ঘদিনে এসব গাছ খালের দুই পাড়জুড়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করে। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বর্তমানে বোয়ালমারীতে দুটি খাল পুনর্খননের কাজ চলছে। গত ২৪ এপ্রিল গুনবহা ইউনিয়নের হরিহরনগর এলাকায় অবস্থিত নদীয়ার চাঁদ ঘাট এলাকায় প্রকল্পের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি। প্রকল্প দুটির মধ্যে একটি হলো– ‘মধুমতি নদী থেকে নদীয়ারচাঁদ ঘাট হয়ে কামারগ্রাম স্লুইসগেট পর্যন্ত খাল পুনর্খনন’ প্রকল্প।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এখানে কাজ শুরুর কয়েকদিনের মধ্যে খালের দুই তীরে গাছ কাটা শুরু হয়। ইতিমধ্যে মেহগনি, রেইনট্রিসহ আড়াই শতাধিক গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কাটা গাছ বন বিভাগে জমা দেওয়ার কথা। তবে মাত্র দুটি গাছ জমা পড়েছে। তারা জানিয়েছেন, ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলাম এবং তাঁর লোকজনই গাছ কাটায় জড়িত।
শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছেন পিনু নামের এক করাতি। তাঁর দাবি, চেয়ারম্যানের নির্দেশেই গাছ কেটে নিচ্ছেন। হাসান নামের আরেক করাতি বলেন, এনায়েত মোল্যা ও মহাদেব নামে দুই ব্যাপারী এসব গাছ কিনেছেন।
গুনবহা কামারগ্রামের বাসিন্দা ইমামুল বলেন, ‘চেয়ারম্যান গাছ কাটাচ্ছেন। আমরা তদারক করছি।’ তবে গুড়দিয়া গ্রামের আফসার উদ্দিন ও হিসাম মোল্যা দাবি করেন, তারা যে গাছগুলো কেটে নিচ্ছেন, সেগুলো তাদের জায়গায় পড়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গুনবহা ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের বোয়ালমারী সদরের ডাকবাংলো রোডের চেম্বারে শনি ও রোববার যান এই প্রতিবেদন। সেখানে তাঁকে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার কল দিলেও ধরেননি। একবার রিসিভ করেও কথা বলেননি।
এদিকে ‘খাল কাটার নামে বৃক্ষ নিধন’ শিরোনামে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ভিডিও এবং নানা পোস্ট ছড়িয়ে পড়লে উপজেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে রোববার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম। গতকাল বিকেলে নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, খাল খনন প্রকল্পে সম্পৃক্ত থাকলেও গাছ কাটার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি বিএনপিরও কারও সম্পর্ক নেই। বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে সামাজিক বনায়ন সমিতির সদস্যরাই গাছ কেটেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই তাঁকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সিরাজুল ইসলাম আরও বলেন, খালের ভেতর অনেকের ব্যক্তিগত মালিকানার জমি আছে। তারাই জমির গাছ কেটে নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা বন কর্মকর্তা দীন মোহাম্মদ মোল্যা বলেন, খাল ও খালপাড়ের গাছ পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে খননকাজের সুবিধার জন্য গাছ অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে নিয়মের বাইরে কোনো কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়।
তারা এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়ে রোববার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিব্বির আহমেদকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছেন। কমিটিতে বন কর্মকর্তা দীন মোহাম্মদ মোল্যাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। অন্য সদস্যরা হলেন– কৃষি কর্মকর্তা আলভি রহমান ও সমাজসেবা কর্মকর্তা কারিজুল ইসলাম। বন কর্মকর্তা দীন মোহাম্মদ মোল্যা জানিয়েছেন, গতকাল এ সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখনও সবাই পাননি। কমিটির সদস্যরা আগামী শনিবার সরেজমিন তদন্ত করতে যাবেন।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল ইসলাম সোমবার নিজ কার্যালয়ে ব্রিফিং করেন। সেখানে তিনি বলেন, বোয়ালমারী পাট উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। খালে পানি না থাকায় কৃষকদের পাট জাগ দিতে সমস্যায় পড়তে হয়। খাল খননের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ করা গেলে তাদের উপকার হবে। নিয়মের বাইরে কোনো গাছ কাটা হলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে ইউএনও বলেন, সরকারি জমির গাছ কেউ ব্যক্তিগতভাবে নিতে পারবেন না; নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- গাছ
