ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

‘৫ গরুর দামে অহন ৭ গরু বেচতাছি’

‘৫ গরুর দামে অহন ৭ গরু বেচতাছি’
×

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাটে গরু নিয়ে যাচ্ছেন একজন বিক্রেতা। গতকাল বুধবার উপজেলার হেলিপ্যাড মাঠে সমকাল

মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ০৮:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘আমার গোয়ালের ৭টা গরু লইয়া আইছি বেচবার লাগি। ক্ষেতের ধান পানিতে নষ্ট হইছে। গরুর খাওন নাই। গরু পালমু কেমনে? নিজের খোরাক জোগাড় করতেই টাসটাস ডাকবো, আবার গরু? এর লাগি সব বেইচ্চা দিছি।’ হাওরের চাষি মমিনউল্লাহর কথায় অসহায়ত্ব। এই অসহায়ত্ব সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে জমির ধান হারিয়ে ফেলার। এই অসহায়ত্ব বহু সাধ করে গোয়ালে পুষে রাখা গরু রক্ষা করতে না পারার।

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুরের মমিনউল্লাহকে মঙ্গলবার পাওয়া যায় মিঠামইনের হেলিপ্যাড মাঠে। প্রতি মঙ্গলবার উপজেলা সদরে কাঠমলের পাশের গরুহাটায় পশুর হাট বসে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে সেই হাট স্থাপন করা হয়েছে ৩০০ গজ দূরের হেলিপ্যাড মাঠে। মমিনউল্লাহর মতো চাষিদের গোয়ালের গরু, ছাগল এখানে বিক্রি হচ্ছে তুলনামূলক সস্তায়। তিনি যেমন বলছিলেন, ‘দুই মাস আগের ৫ গরুর দামে অহন ৭ গরু বেচতাছি। কী করুম এই বছর? ছোডুমুডো (ছোটখাটো) একটা খাসি কোরবানি দিয়া দিমু।’

হাওরে এ বছর ঈদের আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে অকালবন্যা। কৃষকের মনে শান্তি নেই। দুশ্চিন্তায় তাদের চেহারা বদলে গেছে। মমিনউল্লাহর মতো অনেক কৃষক গো-খাদ্যের সংকটের কারণে গোয়ালের সব গরু বাজারে নিয়ে আসছেন বিক্রির জন্য। তাদের চোখেমুখে বিষণ্নতার চাপ। হাটসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ বছর হাটে ভারতীয় গরুর আমদানি নেই। দেশি গরুর আমদানিই বেশি। এর মধ্যে কৃষকের গরু-মহিষই বেশি। খামারিদের গরু খুব কম।

কৃষকেরা বলছেন, কোরবানির জন্য তাদের ঘরে গরু নেই। কোরবানি দেবেন নাকি মহাজনের ঋণশোধ করবেন? এমনকি ধান চাষের জন্য তারা যেসব সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছেন, এসব সমিতির লোকজনও কিস্তির জন্য পিছু ছাড়ছেন না। অন্যদিকে হাওরে এখনও কিছু জমি পানিতে তলিয়ে আছে। যেসব জমির ধান কাটা হয়েছে, সেগুলোতে পচন ধরেছে বা চাড়া গজিয়েছে। 
গতকাল বুধবার সকালেও এই হাট থেকে গরু কিনছিলেন পাইকারেরা। ঢাকার গাবতলী হাটের বেপারি মো. সোলাইমান জানালেন, তারা এক লাখ টাকা থেকে আড়াই লাখ টাকার গরু কিনছেন। এ বছর দেশি গরুর চাহিদা বেশি। এসব গরু বড় বড় বিভাগীয় শহরের কোরবানির হাটে নিয়ে যাবেন। 

স্থানীয় ক্রেতারা বলছেন, গরু-মহিষের চেয়ে এবার ছাগল-ভেড়ার দাম কিছুটা বেশি। কারণ যেসব কৃষক গরু কোরবানি দিতেন, তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতির শিকার হয়েছেন। সামর্থ্য হারিয়ে তারা ছাগল বা ভেড়া কোরবানি দেবেন। মিঠামইনের ঘাগড়া গ্রামের খালপাড়হাটির কৃষক রতন মিয়া তিন অংশীদারের সঙ্গে কোরবানি দেবেন। তিনি বলেন, ৭০ হাজার টাকার গরু ৫২ হাজার টাকায় কিনেছেন। এই গরুটিতে প্রায় দুই মণ মাংস হবে। রতনের ভাষ্য, ‘আজকের (মঙ্গলবার) বাজারে গরু খুব হস্তা। সামনের বাজারে আরও হস্তা হইবো। বনের (খড়) লাগি গরু হস্তা বেইচ্চা দিতাছে।’
মিঠামইন পশুহাটের ইজারাদার মো. শাহেরীল আলম তপনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাটে প্রচুর গরু-মহিষ উঠছে। বেশির ভাগই কিনছেন পশ্চিমের বেপারিরা। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন গবাদিপশু। ভারতীয় গরু একদমই নেই। তিনি জানালেন, মঙ্গলবার থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত হাটে প্রায় ৪ হাজার গরু এসেছে। বিক্রি হয়েছে ৫৫৫টি। আগের নিয়ম অনুযায়ী ক্রেতা-বিক্রেতার কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে হাসিল নিচ্ছেন। তবে তিন লাখ টাকার বেশি দামে গরু বিক্রি হলে হাসিলের হারে কিছুটি ব্যতিক্রম হচ্ছে। 
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হিজেল মাহমুদ বলেন, এ বছর মিঠামইনে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৯ হাজার ১১টি গরু। তবে দুর্যোগের কারণে এই সংখ্যা আরও কমতে পারে। তারা কৃষকের কথা চিন্তা করে ২৫ হাজার টন গো-খাদ্যের চাহিদা পাঠিয়েছেন। 

আরও পড়ুন

×