ঈদযাত্রায় স্বস্তির আভাস, দুর্ঘটনা-ধীরগতির শঙ্কা কাটেনি যমুনা সেতু এলাকায়
তিন দুর্ঘটনায় বিঘ্ন যান চলাচল
হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ ফ্লাইওভারের একটি র্যাম্প খুলে দেওয়া হয়েছে। ছবি: সমকাল
আমিনুল ইসলাম খান রানা, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ১৪:২৭ | আপডেট: ২২ মে ২০২৬ | ১৫:৪৪
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে উত্তরাঞ্চলগামী ঘরমুখো মানুষের যাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফেরাতে নির্মাণাধীন হাটিকুমরুল মোড়ের ‘ক্লৌভার লিভস ইন্টারচেঞ্জ ফ্লাই ওভারের’ বগুড়া-রংপুরমুখী একটি গুরুত্বপূর্ণ র্যাম্প যানচলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে চালু হওয়া এই র্যাম্প ব্যবহারে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনের চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হলেও যমুনা সেতু ও পূর্ব পাড়ে টাঙ্গাইল অংশে যানজট, ধীরগতি এবং দুর্ঘটনার শঙ্কা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
আজ শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত যমুনা সেতুর ওপর ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী লেনে পরপর তিনটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাণহানি না ঘটলেও বাস ও ট্রাকসহ ৬ থেকে ৭টি যানবাহন পেছন থেকে একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত সেতু এলাকায় যান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এবং বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘ সময় ধীরগতির যানবাহনের সারি তৈরি হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালালেও পুরোপুরি স্বাভাবিক গতি ফিরতে সময় লাগে।
যাত্রী ও সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্ঘটনার কারণে ওই সময় যমুনা সেতু এলাকায় যানবাহনের চাপ বেড়ে যায় এবং ধীরগতির দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়, যা ঈদযাত্রার প্রথম দিকেই ভোগান্তির ইঙ্গিত দেয়।
উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল গোলচত্বর দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক সংযোগস্থল। যমুনা সেতু পার হয়ে এই মোড় থেকেই যানবাহন ছড়িয়ে পড়ে রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায়। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার যানবাহন চলাচল করলেও ঈদ মৌসুমে তা বেড়ে প্রায় ৫০ হাজারে পৌঁছে যায়। ফলে প্রতিবছরই এই এলাকায় দীর্ঘ যানজট ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।
চালকদের হুড়োহুড়ি, লেন পরিবর্তনে দুর্ঘটনা
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজউদ্দিন আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় এই প্রতিবেদককে বলেন, ঈদকে সামনে রেখে যমুনা সেতুতে যানবাহনের চাপ ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘ঈদের সময় চালকদের হুড়োহুড়ি, লেন পরিবর্তন ও অসতর্কতার কারণে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও রেকার দিয়ে দ্রুত দুর্ঘটনাকবলিত যান সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩০ হাজার ৬০০ যানবাহন যমুনা সেতু পার হয়েছে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, এই চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যমুনা সেতুর ওপর পুরোনো রেললাইন অপসারণের মাধ্যমে উভয় পাশে প্রায় সোয়া তিন মিটারের বেশি অতিরিক্ত সড়ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী উত্তর ও দক্ষিণমুখী লেন প্রশস্ত করা হলে যান চলাচল আরও নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হবে। তবে আন্তর্জাতিক দরপত্র ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ সম্পন্ন হলেও এখনো মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কাজ শুরু হয়নি।
বিবিএর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজউদ্দিন বলেন, সম্প্রসারণকাজ বাস্তবায়ন হলে আগামী বছরের রোজার ঈদে এ ধরনের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে বলে আমরা আশা করছি।
ভূঞাপুর-এলেঙ্গা সড়কে ধীরগতির আশঙ্কা
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত সড়ক সম্প্রসারণ কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় ওই অংশে ধীরগতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারহান ইমতিয়াজ সুমন। তবে তিনি মনে করেন, হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জের নতুন র্যাম্প চালু হওয়ায় উত্তরাঞ্চলমুখী যানবাহনের চাপ কিছুটা ভাগ হবে।
সড়ক ও জনপদ বিভাগের সাউথ এশিয়া সাবরিজনাল কো-অপারেশন (সাসেক)-২ প্রকল্পের পরিচালক ও সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (অ্যাডমিন) ড. ওয়ালীউর রহমান বলেন, নতুন চালু হওয়া র্যাম্প দিয়ে উত্তরাঞ্চলগামী প্রায় ৬০ শতাংশ যানবাহন চলাচল করতে পারবে। এতে ঈদযাত্রা কিছুটা গতিশীল হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যমুনা সেতুর ওপর চাপ থাকলে পুরোপুরি সমস্যা দূর হবে না। এমনকি ছাড়লেন রাস্তা সম্প্রসারণের সুফল ও ভোগ করা যাবে না। কারণ, মূল সংকট এখনো যমুনা সেতুকেন্দ্রিক।
ঈদে নীলফামারী যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যাংক কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন। তিনি বলেন, গত রোজার ঈদে এলেঙ্গা ও সয়দাবাদ এলাকায় চার-পাঁচ ঘণ্টা যানজটে আটকে ছিলাম। এবারও কিছুটা ভোগান্তির আশঙ্কা আছে, তবে নতুন র্যাম্প চালু হওয়ায় অন্তত হাটিকুমরুল অংশে কিছুটা স্বস্তি মিলবে বলে আশা করছি।
প্রায় ৭৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন আন্তর্জাতিক মানের ‘ক্লৌভার লিভস ইন্টারচেঞ্জ ফ্লাই ওভারের’' প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে এবং যমুনা সেতুর ওপর সম্প্রসারণ কাজ বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
