পশুর হাটে ‘সমঝোতার খেলা’
মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামে বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছেন গরু। নগরীর আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে বড় ট্রাক থেকে নামিয়ে গরুগুলো তোলা হয়েছে পিকআপে। গন্তব্য রঙ্গিপাড়া। শুক্রবার তোলা -মো. রাশেদ
মুকিত রহমানী, সিলেট
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১৩:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট ইজারা নিয়ে ফের সমঝোতা ও সিন্ডিকেটের খেলা চলছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে প্রায় প্রতিবছরই হাট ইজারা হওয়ার অভিযোগ থাকলেও এবার নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে হাটের সংখ্যা কমানো, কম মূল্যে ইজারা এবং পরিচ্ছন্নতা খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় দেখানো নিয়ে।
এবার সিসিক পাঁচটি অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিয়েছে। অথচ অতীতে সাত থেকে ৯টি পর্যন্ত হাট বসত। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ পশুর হাট বসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শাহি ঈদগাহ, মদিনা মার্কেট, রিকাবিবাজার, কদমতলী, সুবিদবাজার ও উপশহর এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক কর্মীদের হাট বসানোর প্রস্তুতির খবর পাওয়া গেছে।
ইজারা দেওয়া হাটগুলোর মধ্যে দক্ষিণ সুরমার কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনাল হাট এক লাখ টাকায় ইজারা নেন নুরুল ইসলাম। যদিও গত বছর এ হাটের ইজারা মূল্য ছিল প্রায় চার লাখ টাকা। এবার পরিচ্ছন্নতা বাবদ দেড় লাখ টাকা, সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১০ শতাংশ আয়কর যোগ হয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
নগরীর তেমুখী এলাকার পশুর হাট এক লাখ ২০ হাজার টাকায় মোরাদ হোসেনের নামে ইজারা নেন ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা উসমান হারুন পনিরসহ যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন সাবেক নেতা। গত বছরের মতো এবারও প্রায় একই মূল্যে ইজারা হলেও পরিচ্ছন্নতা খাতে দেড় লাখ টাকা যোগ হওয়ায় ভ্যাট-ট্যাক্সসহ মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা। মিরাপাড়ার আব্দুল লতিফ প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন খালি জায়গার হাট মাত্র ৩০ হাজার টাকায় ইজারা পান কামরুল হাসান। তবে এক লাখ টাকা পরিচ্ছন্নতা ব্যয় এবং অন্যান্য কর যোগ হয়ে মোট অর্থ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা।
সবচেয়ে বেশি দামে ইজারা হয়েছে শাহপরাণ (রহ.) বাজার সংলগ্ন খালি জায়গার পশুর হাট। গত বছর ৮০ হাজার টাকায় ইজারা হওয়া এ হাট এবার ১১ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ টাকায় নেন সরকারদলীয় কর্মী এনামুল হক কুটি। পরিচ্ছন্নতা খাতে আরও এক লাখ টাকা যোগ হয়ে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা। নতুন যুক্ত হওয়া দক্ষিণ সুরমার তেতলি এলাকার এসফল্ট মাঠের হাট ৫০ হাজার টাকায় ইজারা নেন জেলা যুবদলের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক মকছুদুল করিম নুহেল। পরিচ্ছন্নতা ব্যয়, করসহ এ হাটের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা।
সিসিকের বাজার তত্ত্বাবধায়ক আলবাব আহমদ জানিয়েছেন, এবার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে মাছিমপুর কয়েদির মাঠ ও টিলাগড় পয়েন্ট এলাকার হাট। গত বছর শুধু মাছিমপুর হাট থেকেই ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ইজারা পাওয়া গিয়েছিল। এবার পাঁচটি হাট থেকে মোট ইজারা মূল্য ১৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা এবং সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা। গত বছর সাতটি হাট থেকে মোট রাজস্ব ছিল প্রায় ৫৬ লাখ টাকা।
হাটগুলোর মধ্যে দূরত্ব দুই থেকে সাত কিলোমিটার পর্যন্ত হওয়ায় মাঝামাঝি এলাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে পশুর হাট বসতে পারে। সিসিকের এক কর্মকর্তা বলেন, গত বছর শেষ দুই দিনে অন্তত চার স্থানে অবৈধ হাট বসেছিল। এবার হাট কম হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এদিকে ইজারা প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক নিলামের বদলে সমঝোতার মাধ্যমে আগে থেকেই ইজারাদার নির্ধারণ করা হয়েছে। উন্মুক্ত নিলাম হলে সিসিক আরও বেশি রাজস্ব পেত। এখানে রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেট কাজ করেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিসিক প্রশাসক মো. আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘হাট কম হলেও রাজস্ব কমেনি। স্থায়ী কাজিরবাজার পশুর হাট থেকে এবার প্রথমবারের মতো তিন কোটি টাকা রাজস্ব এসেছে। সব মিলিয়ে সিসিক লাভবান হয়েছে।’ অবৈধ হাট প্রসঙ্গে বলেন, ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হবে। কেউ অবৈধভাবে হাট বসানোর চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেবেন।
- বিষয় :
- গরুর হাট
- কোরবানির হাট
