হাওরাঞ্চল প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতিবন্ধকতা কাটেনি
ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৮:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুনামগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ নানামুখী সংকট ও সীমাবদ্ধতার মাঝে। এ নিয়ে বিভিন্ন মহল সরব থাকলেও প্রভাব পড়েনি খুব বেশি। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়লে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে এ অঞ্চলে। আসছে বর্ষার আগে তাই আবারও উঠে এসেছে হাওরের প্রাথমিক শিক্ষায় সংকটের কথা।
জানা গেছে, নানা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াও কোনো কোনো শিক্ষকের ইচ্ছাকৃত দেরিতে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর ফলে সামাজিক মাধ্যমে ট্রলের শিকার হচ্ছেন। এসব বিতর্কিত শিক্ষকের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন দায়িত্বশীলরাও। এমন পরিস্থিতিতে হাওরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্ণ চেহারা নিয়ে ক্ষোভ ঝারছেন অনেকেই। তবুও এ সংকট থেকে উত্তরণ মিলছে না।
স্থানীয় অভিভাবকদের একাংশের দাবি, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারির অভাব, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ফাঁকিবাজ শিক্ষকদের উদাসীনতার কারণে দায়িত্বশীল শিক্ষক এবং প্রাথমিক শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয় শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিলে হাওরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
ধর্মপাশা উপজেলা সদর থেকে পূর্ব দিকে চার কিলোমিটার ও উত্তর দিকে ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার এবং দূর থেকে দেখতে দ্বীপের মতো মধ্যনগর উপজেলা সদর বাজার পেরোলেই বিস্তীর্ণ হাওর। হেমন্তে দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠ আর বর্ষায় যে দিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। শুধু বর্ষায় নয়; বছরজুড়েই দুই উপজেলা সদর ও তার আশপাশের বিদ্যালয়গুলো ছাড়া হাওরপারের প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক পরে শুরু হয়। আবার শেষ হয় আগেভাগে। দুর্গম এলাকায় অবস্থিত এসব প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সুবন্দোবস্ত না থাকায় এমনটি হয়ে থাকে বলে দাবি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো শিক্ষক পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনা জেলা শহর ও নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন এবং সেখান থেকে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন। ফলে ওই শিক্ষকেরা যেমন নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারেন না, তেমনি দুপুর ২টা থেকে ৩টার মধ্যে বিদ্যালয় ছাড়েন; যা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর প্রভাব ফেলছে।
গত ১৪ মে মধ্যনগর উপজেলার ৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে কোনোটিতেই কোনো শিক্ষকের দেখা পাননি স্থানীয় এমপি কামরুজ্জামান কামরুল। এ সময় এমপি বিদ্যালগুলো তালাবদ্ধ পান। এমপির পরিদর্শনের ভিডিও মুহূর্তেই ফেসবুকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরে ওই বিদ্যালয়ের ১২ জন শিক্ষককে শোকজ করা হয়। এদিকে এমপির আকস্মিক পরিদর্শনে দুই উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হলেও অনেক শিক্ষক এই পরিদর্শনকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন পরামর্শও দিয়েছেন ফেসবুকে। আবার অনেক শিক্ষক এমপির প্রিয়ভাজন হওয়ার চেষ্টায় অভিযুক্ত ওই ১২ শিক্ষককে নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনাও করেছেন; যা নিয়ে ফেসবুকে পাল্টাপাল্টি লেখালেখি করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টাও করছেন কয়েকজন শিক্ষক।
বাকাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চ.দা.) আমিমুল এহসান বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়া বা বৃষ্টি হলে নৌকা না পাওয়া, ঝড়ের কবলে পড়ার আশঙ্কা, নৌকা পাওয়া গেলেও মাত্রাতিরিক্ত ভাড়ার কারণে শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনিচ্ছা দূরীকরণে বিদ্যালয়গুলোতে আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষকদের এ দাবি বাস্তবায়িত হলে বর্ষায় নৌকা আর হেমন্তে মাইলের পর মাইল হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হবে না। এতে করে শিক্ষকেরা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থেকে আনন্দের সঙ্গে পাঠদানে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
কালাগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খোরশেদ আলম বলেন, ‘সমস্যা যেমন আছে সমাধানও আছে। প্রতিকূল পরিবেশে শিক্ষকেরা যে শিক্ষাব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে সেজন্য তাদের ধন্যবাদও দিতে হবে। সেই সঙ্গে সমাধানের রাস্তাও তৈরি করে দিতে হবে।’
ধর্মপাশা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দ্বীন মোহাম্মদ এবং মধ্যনগরের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ধর্মপাশায় ৭ জন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মধ্যে আছেন মাত্র একজন। মামলা-সংক্রান্ত জঠিলতার কারণে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে।
দুই উপজেলা কর্মকর্তা সঞ্জয় ঘোষ ও জনি রায় বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের জন্য নৌযানের ব্যবস্থা করা হলে সঙ্কট কমে আসবে।
- বিষয় :
- শিক্ষা
