চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর হাট
ঐতিহ্যবাহী ‘লাল বিরিষ’ গরুতে আগ্রহ ক্রেতার
লাল বিরিষ জাতের গরুর চাহিদা বেশি
তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামে কোরবানিতে বিশেষ এক জাতের গরু বেশ জনপ্রিয়। নাম ‘লাল বিরিষ’। এই গরুকে ‘চিটাগাং রেড ক্যাটেলও’ বলা হয়ে থাকে। দেখতে বেশ সুন্দর ও সতেজ। আকারে অবশ্য খুব একটা বড় হয় না। তবে এই গরুর মাংস খেতে সুস্বাদু। তাই দামও তুলনামূলক বেশি। চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর বাজারে জনপ্রিয় এই গরুর চাহিদা বেশি। দেখতে একেবারে লাল রংয়ের হয়ে থাকে। তবে লাল হলেই লাল বিরিষ নয়। চট্টগ্রামের লাল বিরিষের শরীরের আটটি স্থানে কড়া লাল রং থাকে। এসব গরুর মুখ বা থুতনি, শিং, পা, পায়ের খুর, চোখের চারপাশ, লেজের গোছা, মলদ্বার, প্রজনন অঙ্গ ও ওলান, অর্থাৎ বাঁট লাল রংয়ের হলেই বুঝতে হবে গরুটি খাঁটি লাল বিরিষ। এ জন্য এই গরুকে অষ্টমুখী গরুও বলা হয়ে থাকে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে এ বছর কোরবানি দেওয়ার মতো ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজারটি স্থানীয় বিশেষ জাতের লাল বিরিষ পালন করা হয়েছে। সব এলাকায় কমবেশি লাল বিরিষ পাওয়া গেলেও দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, উত্তর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান ও ফটিকছড়িতে এই জাতের গরু সবচেয়ে বেশি পালন করা হয়। এর বাইরে ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লায়ও কিছুসংখ্যক লাল বিরিষ পাওয়া যায়। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এই গরুর প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। অনেক খামারিই এ জন্য সিমেন (বীজ) সংগ্রহ করছেন।
বিবিরহাট হচ্ছে চট্টগ্রাম নগরের অন্যতম একটি পশুর হাট। কোরবানি উপলক্ষে এই হাট ঘুরে দেখা গেছে, বিশুদ্ধ জাতের লাল বিরিষের চেয়ে সংকরায়ন করা লাল বিরিষের সংখ্যাই বেশি। সাবের হোসেন নামে একজন ব্যাপারী সমকালকে বলেন, ‘গ্রামের অনেকেই অন্যজাতের ষাঁড়ের সঙ্গে ক্রস করছেন। ফলে বিশুদ্ধ লাল বিরিষ কমে আসছে। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা চিহ্ন দেখে লাল বিরিষ কিনে থাকেন।’
বিবিরহাটেই গরু কিনতে আসা নগরের বহদ্দারহাট-সংলগ্ন আরাকান হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা আলী আকবর নেওয়াজ বলেন, ‘চট্টগ্রামের অনেক মানুষ খাঁটি লাল বিরিষ ছাড়া কোরবানি দেন না। এই গরু চট্টগ্রামের মানুষের আবেগ আর ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।’
দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সরকারহাট হচ্ছে গরুর বড় একটি বাজার। দূরদূরান্ত থেকে আসা লোকজন এই হাট থেকে গরু কিনে নিয়ে যান। অনেক ব্যাপারীও এখান থেকে গরু কিনে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যান। এবার এই হাটে বেশকিছু স্থানীয় জাতের লাল বিরিষ বাজারে ক্রেতাদের নজর কাড়ছে। আহমেদ হোসেন নামে এলাকার একজন ব্যাপারী দক্ষিণ চট্টগ্রামে লালন করা কিছুসংখ্যক লাল বিরিষ অর্থাৎ অষ্টমুখী গরু সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য হাটে তুলেছেন।
আহমেদ হোসেন সমকালকে বলেন, ‘বাজারে লাল গরু দেখে অনেকেই স্থানীয় জাতের মনে করে কিনে নিয়ে যান। কিন্তু গায়ের রং লাল হলেই স্থানীয় জাতের লাল বিরিষ হবে– এমন কোনো কথা নেই। এই ধরনের গরুর শরীরের বিশেষ আটটি জায়গায় লাল রং থাকে। এসব চিহ্ন দেখে গরু কিনলে কেউ ঠকবেন না। খাঁটি জাতের লাল বিরিষ সংগ্রহ করে বাজারে তুলেছি। ইতোমধ্যে বেশির ভাগ গরু বিক্রি হয়ে গেছে।’
সরকারহাটের ব্যবসায়ী আহমেদ হোসেনের কাছ থেকে গরু কিনেছেন এনসিসি ব্যাংকের আনোয়ারা শাখার ব্যবস্থাপক আজাদ মইনুদ্দিন। তিনি সমকালকে বলেন, ‘স্থানীয় জাতের লাল বিরিষ আমার খুব প্রিয়। তাই এবারও এই জাতের একটি গরু কিনেছি। মাংসের দাম হিসাব করলে এবার প্রতি মণ মাংসের দাম পড়ছে ৩৩ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।’
পটিয়ার দক্ষিণ ভূর্ষি ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডে ‘অষ্টমুখী’ লাল গরুর খামার করেছেন মো. আজিজ উদ্দিন। তাঁর ফার্মে বিভিন্ন সাইজের ১৫টি লাল বিরিষ দেখা গেল। তিনি বলেন, চাহিদা থাকলেও সংকরায়নের ফলে এই জাতের গরু স্বকীয়তা হারাচ্ছে। খুঁজে খুঁজে ছোট ছোট লাল বিরিষ সংগ্রহ করতে হয়।
ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত অন্যান্য জাতের যে গরুর দাম এক লাখ টাকা, চট্টগ্রামের লাল বিরিষ হলে দাম পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর সমকালকে বলেন, বিশুদ্ধ জাতের লাল বিরিষ যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য সরকারিভাবেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাভারে সরকারি খামারে স্বাস্থ্য-সবল গরুর সিমেন (বীজ) সংরক্ষণ ও আগ্রহীদের মধ্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- গরু
