গ্রামের চেয়ে চট্টগ্রাম নগরে দ্বিগুণ শিশু ধর্ষণের শিকার
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ০৮:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম নগরের জামালখানে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ শেষে খুন করে লাশ বস্তায় ভরে নালায় ফেলে দেওয়া হয় ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর। তিন দিন পর নালা থেকে লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পাশের গলির দোকানদার লক্ষ্মণ দাশকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সে শিশুটিকে লোভ দেখিয়ে দোকানের গুদামে নিয়ে ধর্ষণ শেষে খুন করে।
মামলা হলে তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিটও দেয় পুলিশ। কিন্তু প্রথম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীর ধর্ষণ ও খুনের বিচার শুরু হয়নি সাড়ে তিন বছরেও। গত ২৫ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন থাকলেও শুনানি হয়নি। দুই মাস পর আগামী ২৫ জুন মামলার অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করেন আদালত।
সাড়ে পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় মো. কাউছার নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও সেই মামলায় বিচার পাচ্ছে না ভুক্তভোগীর পরিবার। বাড়িতে শিশুটির মা-বাবার অনুপস্থিতির সুযোগে কাউছার তাকে একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করে। নানি শিশুটিকে গোসল করাতে নিয়ে রক্তক্ষরণ দেখতে পেয়ে পরে তার মা-বাবাকে জানান। তারা শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেই মামলার বিচার শুরু হলেও সাড়ে পাঁচ বছরে মাত্র একজনের সাক্ষ্য নিয়েছেন আদালত। আরও আটজনের সাক্ষ্য নেওয়া বাকি।
গত বছরের (২০২৫) ১০ মার্চ নিজের শিশুসন্তানকে ধর্ষণ করেন এক ব্যক্তি। ভুক্তভোগীর মা নগরীর কোতোয়ালি থানায় মামলা করলে পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে। সেই মামলায় আদালতে চার্জশিট দেওয়া হলেও এখনও শুরু হয়নি বিচার।
এভাবে চট্টগ্রামের আদালতে আলোচিত থেকে সাধারণ ধর্ষণ মামলার চার্জশিট জমা দেওয়ার পর এক থেকে দুই মাস পরপর শুনানির তারিখ পড়ছে। অধিকাংশ মামলায় পাবলিক ও পুলিশ সাক্ষী হাজির হচ্ছে না। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হাজির করার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহও দেখা যাচ্ছে না।
আদালতে শিশু ধর্ষণের মামলার চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে গ্রামের চেয়ে দ্বিগুণ শিশু ধর্ষণের শিকার হয় নগরে। গত আট বছরে নগরে ৬৭২টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর গ্রামে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৯৩ শিশু। নগর ও গ্রামের শিশু ধর্ষণের ১০৬৫টি মামলার বিচার চলছে চট্টগ্রাম শিশু ধর্ষণ আদালতে। সরকার শিশু ধর্ষণে দ্রুত বিচারের জন্য পৃথক শিশু ধর্ষণ আদালত সৃষ্টি করলেও নিয়োগ দেননি কোনো পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) বা সরকারি কৌঁসলি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর পিপি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে শিশু ধর্ষণ আদালতে ভারপ্রাপ্ত পিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর পিপি মাহমুদ-উল আলম চৌধুরী মারুফ সমকালকে বলেন, ‘আমি মূলত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর পিপি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে দায়িত্ব পালন করছি। শিশু আদালত নতুন হওয়ায় এখানে কোনো পিপি নিয়োগ দেয়নি সরকার। আমি মূল দায়িত্বের বাইরে ভারপ্রাপ্ত পিপি হিসেবে রুটিন দায়িত্ব পালন করছি। শিশু ধর্ষণ আদালতে কয়টি মামলা আছে সেই তথ্যও আমার জানা নেই। আমি গুরুত্বপূর্ণ মামলা থাকলে শুনানিতে যাই। যতটুকু জানি, সাক্ষী হাজির না হওয়ায় দ্রুত মামলার রায় হচ্ছে না। পুলিশ সাক্ষী হাজির করতে পারলে শিশু ধর্ষণের বিচার দ্রুত শেষ করা সম্ভব।’
মানবাধিকার আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘আমি নিজে চাঞ্চল্যকর শিশু বর্ষা খুন ও ধর্ষণ মামলায় বাদীর আইনজীবী হিসেবে লড়াই করছি। স্পর্শকাতর শিশু ধর্ষণের মামলায় ডিএনএ রিপোর্ট ও দ্রুত তদন্ত শেষ করতে পুলিশ অনেক সময়ক্ষেপণ করে। চার্জশিট হওয়ার পর আদালতে মামলা এলে দ্রুত বিচার পাওয়া যাচ্ছে না। বর্ষার আলোচিত মামলাটির সাড়ে পাঁচ বছর কেটে গেলেও এখনও অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুই করতে পারছি না। পদে পদে আইনি প্যাঁচে ফেলে আসামিপক্ষ সময়ক্ষেপণ করছে।’
আরেক আইনজীবী জাফর ইকবাল বলেন, সরকার শিশু ধর্ষণের বিচার দ্রুত শেষ করার জন্য পৃথক আদালত গঠন করেছেন। কিন্তু স্বতন্ত্র সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নিয়োগ দিচ্ছে না কেন? ওই আদালতে একজন পিপি থাকলে শিশু ধর্ষণের মতো স্পর্শকতার মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার ক্ষেত্রে তার রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা থাকত। এখন পিপি না থাকায় রাষ্ট্রের কোনো দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হচ্ছে না। এক হাজার শিশু ধর্ষণের মামলার বিচারে তাই গতি নেই।
গত ২১ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রাম শিশু ধর্ষণ আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। এখানে ধর্ষণের শিকার ১৬ বছরের নিচের শিশুর মামলার বিচার হচ্ছে। নগরের ১৬ থানার ৬৭২টি শিশু ধর্ষণ মামলা এবং জেলার ১৬ থানার ৩৯৩ ধর্ষণের মামলার বিচার চলছে। বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের মধ্যে পুলিশ তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল করা মামলাগুলো রয়েছে। চট্টগ্রামে গত তিন দিনে ছয় শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে।
- বিষয় :
- শিশু
