ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রংপুর

পশুর হাটে দালালের দৌরাত্ম্য অসহায় ক্রেতা-বিক্রেতা

পশুর হাটে দালালের দৌরাত্ম্য অসহায় ক্রেতা-বিক্রেতা
×

ছবি: ফাইল

আলতাফ হোসেন দুলাল, রংপুর

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১০:২৬

বৃহস্পতিবার সারাদেশে ত্যাগের মহিমায় উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। সে হিসাবে মুসলিমদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার মাত্র দুদিন বাকি। এই ঈদকে আমাদের দেশে কোরবানির ঈদ বলে অবিহিত করা হয়। পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ সামনে রেখে রংপুরে জমে উঠেছে পশু কেনাবেচার হাট।

রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এবার কোরবানির পশু প্রস্তুত আছে তিন লাখ ৬৬ হাজার ৫৯১টি। বিপরীতে চাহিদা রয়েছে দুই লাখ ২৬ হাজার ৯৬৬টির। ফলে এক লাখ ৩৯ হাজার ৬২৫টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। জেলায় ৬১টি হাটে কোরবানির পশু কেনাবেচা হচ্ছে।

এদিকে হাটগুলোতে পশু কেনাবেচা বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে দালালদের দৌরাত্ম্য। দালাল চক্রের কাছে অসহায় ক্রেতা-বিক্রেতা। দালালরা উভয় পক্ষের কাছ থেকেই অর্থ হাতিয়ে নেয়। তাদের ছাড়া পশু কেনাবেচা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হাটের ইজারাদারদেরও অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে দেখা যায় এই চক্রের কাছে।

দালালরা হাটে গরু কেনাবেচার ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে দুর্বোধ্য সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করেন। ভাষাগুলোর অর্থ দালাল ও গরু ব্যবসায়ী ছাড়া কেউ বুঝতে পারে না। অন্তত ১০ জন দালালের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা নিজেরা সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে পশুর দাম নির্ধারণ করেন। কয়েকটি শব্দের অর্থ এমন– চামটি মানে চার হাজার, বন্নি পাঁচ হাজার, টিপি ছয় হাজার, ঝালি সাত হাজার, কাটা আট হাজার, কুটাল মানে ৯ হাজার ইত্যাদি। গরু কেনাবেচার সময় তারা নিজেদের সৃষ্টি এসব ভাষায় কথা বলেন। পশুর হাটে গেলে এ ভাষাগুলো হরহামেশায় শোনা যায়।

গতকাল রোববার লাহিড়ীর হাটে কথা হয় বড়বাড়ি গ্রামের কৃষক কান্দুরা মিয়ার সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করেন, দুটি কোরবানিযোগ্য গরু হাটে নিয়ে আসামাত্র দালাল দড়ি ধরে পশুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।

কান্দুরা মিয়া বলেন, ‘কষ্ট করি গরু পুষি। কিন্তু হাটে আনামাত্র দালালরা গরু ঘিরি ধরিয়া নেজেরা চামটি-ঘামটি কি সব কয়া ৬৫ হাজার টাকা দিবার চায়া মোর গোড় থাকি গরুর দড়ি নেছে। তাক বেচাইলো ৭৭ হাজার টাকাত। পরে মোক জোর করি টাকা দেছে ৬৪ হাজার।’

একই ধরনের অভিযোগ করেন গতকাল রোববার কাউনিয়া হাটে গরু নিয়ে আসা খামারি তৈয়ব আলী। তিন বলেন, ‘হাটোত গরু নিয়া আসামাত্র তারা (দালালরা) ঘিরে ধরে। তারা তারায় চামটি, ঝালি, বন্নি–এইসব কথা কয়া আগে নেজেরা গরুর দাম নির্ধারণ করে। পরে বিক্রেতার সঙ্গে ভালো ভাষায় দরদাম করে গরুর দড়ি অনেকটা জোর করে দালালরা হাতে নেয়। সেই গরু দালালরা বেশি দামে বিক্রি করে পরে গরুর মালিককে টাকা দেয়।’

গত বৃহস্পতিবার বদরগঞ্জ হাটে গিয়ে কথা হয় সমছের আলীর সঙ্গে। তিনিও অভিযোগ করেন, দালালরা তাঁর দুটি গরু এক লাখ ৫৬ হাজার টাকায় বিক্রি করলেও তাঁকে দিয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বাকি টাকা দালালরা ভাগ করে নিয়েছে।

গত শনিবার কাউনিয়া হাটে কথা হয় খামারি জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, দালাল ছাড়া গরু বিক্রি করা মুশকিল। ওরায় (দালালরা) গরুর দড়ি একজন ধরি থাকে, তিনজন ক্রেতা সাজিয়া দাম করে।

রংপুর নগরের প্রয়াস বিনোদন কেন্দ্রের পাশের কোরবানির পশুর হাটে গরু বিক্রি করতে আসা খামারি শওকত আলী বলেন, ‘নিজের গরু নিজে হাটোত কোনোদিন বেচপার পাইরবের নেন। দালাল লাগবেই। না হইলে দালালরা গরু ঘিরে ধরি থাকপে। গরু কিনে ইয়াক (ক্রেতা) কাচোত ভিড়বার দিবার নেয় দালালরা।’

গত শনিবার বদরগঞ্জ উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের পাঠানের হাটে গিয়ে একই চিত্র দেখা যায়। কৃষক আনারুল ইসলাম একটি গরু নিয়ে হাটে আসামাত্রই কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে ঘিরে ধরে। তারা গরুর দাম কমানোর চেষ্টা করে এবং অন্য ক্রেতাদের বলতে থাকে গরু বেচা হয়েছে। পরে জানা যায়, তারা গরুর দালাল। মিনিট সাতেক পরে গিয়ে দেখা যায়, আনারুল ইসলামের হাতে গরুটি নেই। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ওমার (দালালদের) সাথে পারনো না। ৭৫-৮০ হাজার টাকার গরু ৬৮ হাজার টাকা জোর করি হাতোত দিয়া নিয়া গেইচে।’

হাটের দায়িত্বে থাকা দুলাল মিয়া বলেন, ‘দালাল ছাড়া গরু বেচাও হবার নেয়, কেনাও হবার নেয়। দালাল লাগবেই। আমার হাটে দালালরা গরু ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে কখনই বাড়াবাড়ি বা জোর জবরদস্তি করেন না। হাট কমিটির পক্ষ থেকে আমরা কড়া নজরদারি করি।’

গত মঙ্গলবার থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ছয় দিনে রংপুরের ১৪টি কোরবানির পশুর হাট ঘুরে শতাধিক বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাটে গরু ওঠার আগে কিংবা নিয়ে আসামাত্রই দালালরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে দরদাম করে গরু নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরে বিক্রি করে অনেক সময় বিক্রেতার সঙ্গে আগে ঠিক করা দামের চেয়ে কম টাকা দিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে।
কাউনিয়া হাটে গরু কিনতে আসা চাকরিজীবী ইয়াছিন আলী বলেন, দালাল ধরে গরু কিনতে হয়। না হলে ৬৫ হাজার টাকার গরু দালাল এক লাখ টাকা দাম চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দালাল কী সব ভাষা-টাষা বলে দাম কমায়। পরে দালালকে বকশিশ দিতে হয়।

আরও পড়ুন

×