ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মান্দার তিন গ্রাম শোকে স্তব্ধ

বাড়ি ফিরল ১০ লাশ

মান্দার তিন গ্রাম শোকে স্তব্ধ
×

নিহতের স্বজনদের আহাজারি

নওগাঁ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১৯:৫৪ | আপডেট: ২৫ মে ২০২৬ | ১৯:৫৯

ঈদ সামনে। ঈদ উপলক্ষে কয়েক মাস পর বাড়ি ফিরছেন-রোববার রাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এ কথা বলেন তারা। কেউ মেয়ের জন্য কেনেন খেলনা, কেউ বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য নতুন কাপড়। কিন্তু সেই আনন্দ আর ঘরে পৌঁছায়নি। টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১০ জনই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভাঁরশো ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে একই গ্রামের সাতজন। অন্য তিনজন দুই গ্রামের। মান্দার এই তিন গ্রাম শোকের স্তব্ধ।

সোমবার দুপুরে মান্দার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুরো গ্রামজুড়ে শোকের স্তব্ধতা। কোনো বাড়িতে রান্না হয়নি। উঠানজুড়ে স্বজন হারানো মানুষের কান্না। আশপাশের গ্রামের মানুষজন এসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এটিই আরও ভারি করে তুলছে পরিবেশ।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের তারেক (২১), বাদশা মিয়া (৩০), আবদুল বারিক (২০), সোহাগ হোসেন (২১), রবিউল ইসলাম (২৮), মাইনুর ইসলাম (৩০) ও সাগর হোসেন (২০); পাকুড়িয়া গ্রামের সহোদর মাইনুর রহমান (২৫) ও গিয়াস উদ্দিন (২২); এবং মশিদপুর গ্রামের সুজন আলী (৩৫)। এছাড়া নিয়ামতপুর উপজেলার মালঞ্চি গ্রামের সারিকুলও নিহত হয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহতদের অধিকাংশই পেশায় মৎস্যজীবী পরিবারের সদস্য। বছরের একটি সময় বিল ও জলাশয়ে মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু বর্ষা শেষ হলে আয় বন্ধ হয়ে যায়। তখন সংসারের খরচ চালাতে তারা দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ফেরি ব্যবসা করতেন। সাইকেলে করে গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্লাস্টিকের বালতি, জগ, খেলনা ও গৃহস্থালি পণ্যের বিনিময়ে মাথার চুল, নষ্ট মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ করতেন।

সবশেষ তারা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার উত্তর নাজিরপুর এলাকায় ছিলেন। ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে রোববার রাতে ফেনী থেকে একটি রডবোঝাই ট্রাকে করে জন প্রতি ৩৫০ টাকা ভাড়ায় বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। সোমবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিহাতীর সরাতৈল এলাকায় ট্রাকটি উল্টে গেলে রডের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান অনেকে।

রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের সোলাইমান আলী জানান, তিনিও ওই দলের সঙ্গে ফেরি করতেন। তবে তিনি অন্য একটি গাড়িতে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে নোয়াখালীতে ছিলাম। তারা আগের গাড়িতে উঠছিল। আমরা পরের গাড়িতে ছিলাম। টাঙ্গাইল পার হওয়ার পর দেখি একটা ট্রাক উল্টে পড়ে আছে। পরে যমুনা সেতু পার হওয়ার পর জানতে পারি, মারা যাওয়া লোকজন আমাদের গ্রামের।’

নিহত বাদশা মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। স্বামীর ব্যবহৃত কাপড় আঁকড়ে ধরে বিলাপ করছিলেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘রাতে দুইবার কথা হছে। বেটির জন্য খেলনা কিনিছে। বেটি খুশি হয়ে ছিল-বাবা খেলনা নিয়ে আসবে। এখন হামার বেটিক কী বলমু? ওর বাপ কই?’

নিহত মাইনুর ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধ মা-বাবা নির্বাক হয়ে বসে আছেন। তিন বছর বয়সী ছেলে কিছুই বুঝতে না পেরে ঘরের এক কোণে খেলছিল। মাইনুরের চাচাতো ভাই রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ভাই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। অসুস্থ মা-বাবা, স্ত্রী আর ছোট সন্তান নিয়ে সংসার চলত তার আয়েই। এখন এই পরিবার কীভাবে চলবে, আমরা জানি না।’

গ্রামের বাসিন্দা নাসিরউদ্দিন বলেন, ‘তারা সবাই খুব গরিব মানুষ। পেটের দায়ে বাড়ি ছেড়ে বাইরে গিয়ে ফেরি করত। আমাদের গ্রামে একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু কখনও হয়নি। পুরো গ্রামটাই এখন শোকে ডুবে আছে।’ তিনি সরকারের কাছে নিহত পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তার দাবি জানান।

মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে ১৩ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। মরদেহ আনা ও স্বজনদের সহযোগিতায় পুলিশ কাজ করছে।

ঈদ সামনে রেখে যখন চারদিকে উৎসবের প্রস্তুতি, তখন মান্দার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে এখন শুধুই কান্না। শিশুদের নতুন জামার স্বপ্ন থেমে গেছে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অপেক্ষা শেষ হয়েছে লাশের খবর দিয়ে। আর যে মানুষগুলো পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ঘর ছাড়তেন, তারাই এবার ফিরলেন কাফনে মোড়া হয়ে।

আরও পড়ুন

×