নেত্রকোনার কংস নদ
৫৬ বছরেও সেতু নেই, আক্ষেপ তিন উপজেলার বাসিন্দাদের
নেত্রকোনা-দুর্গাপুর সড়কপথে কংস নদ পাড়ি দিতে এখনও একমাত্র ভরসা নৌকা -সমকাল
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৮:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্বাধীনতার ৫৬ বছরে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ওপর ছোট বড় কত সেতু হয়েছে, কিন্তু নেত্রকোনা-দুর্গাপুর সড়কপথে কংস নদ পাড়ি দিতে এখনও একমাত্র ভরসা নৌকা। স্থানীয়দের আক্ষেপ, একটি সেতুর অভাবে দুর্গাপুর, পূর্বধলা ও নেত্রকোনা সদর উপজেলা পূর্বধলার ডেউটুকোন এলাকায় পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে।
নৌকায় নদ পাড়ি দিয়ে জেলা ও উপজেলা শহরে যাতায়াত করতে হয় নদীর দুই পাড়ের বাসিন্দাদের। এভাবে চলাচল করতে গিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তিন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ।
স্থানীয়রা বলছেন, কংস নদের ওপর কোনো সেতু না থাকায় যুগ যুগ ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে মানুষকে। ঝড়বাদলের দিন মাঝে মধ্যেই নৌকা ডুবে দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। বহু বছর ধরেই ওই তিন উপজেলার বাসিন্দারা নেত্রকোনা-দুর্গাপুর সড়কে এই নদের ওপর সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না।
নদী তীরবর্তী বড়ওয়ারী গ্রামের কৃষক আবদুল মান্নান বলেন, ‘অনেক আগে থাইক্কা নৌকায় কইরা এই নদী পার হইতাছি। ইলেকশনের সময় হইলে নেতারা কংস নদীর ওপরে পাক্কা ব্রিজ কইরা দেওনের কথা কয়। তারা কথা দেয় নৌকায় কইরা আর আমাদের গোদারা পার হওন লাগব না। কিন্তু ব্রিজ আর হয় না। আমরা সরকাররে খাজনা দেই কিন্তু ব্রিজ কেন দেয় না? এই সড়কটা দিয়া তিনটা উপজেলার মানুষ যাতায়াত করে। তাঁদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক নৌকায় কইরা নদী পার হয়। পার্শ্ববর্তী কলমাকান্দার সিধলী গ্রামের শফিকুল ইসলাম কুদ্দুছ বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন এলাকার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু কংস নদের ওপর একটি সেতু নির্মাণ হলো না।’ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও কেউ আর বিষয়টি দেখে না।
ডেউটুকোন খেয়াঘাট পার হওয়ার সময় যখন শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের দাখিনাইল গ্রামের কৃষক রাশিদ মিয়া বলেন, এই রাস্তা দিয়া সপ্তাহে তিন দিন আমাকে জেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু সেতু না থাকায় নৌকার জন্য অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়। বর্ষাকালে নদীতে স্রোত বেশি থাকে, তখন দুর্ভোগটা আরও বাইড়া যায়। এমন আক্ষেপ শুধু রাশিদ মিয়ার নয়, কংস নদের ঢেউটুকোন ঘাটের দুই পারের লাখো মানুষের আক্ষেপ এটি।
নেত্রকোনা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অফিস সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনা জেলা শহরের রাজুর বাজার মোড় থেকে দুর্গাপুরের বিরিশিরি পার্সি চালস নল (পিসিনল) মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে সোমেশ্বরী নদীর তীর পর্যন্ত সাড়ে ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক রয়েছে। সওজের অধীন সড়কটি নেত্রকোনা সদর ও পূর্বধলা উপজেলার অংশে ১২ কিলোমিটার। বাকি অংশ দুর্গাপুর উপজেলায়। সড়কের মধ্যে অর্থাৎ ১২ কিলোমিটার অংশ যেখানে শেষ সেই স্থান ডেউটুকোন এলাকায় কংস নদের ওপর সেতু না থাকায় তিন উপজেলার মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সেতু না থাকায় ফেরি দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক কাজে দুর্গাপুর, পূর্বধলা ও নেত্রকোনা জেলা সদরে আসা যাওয়া করতে হয়। পথ কম থাকায় ওই সড়ক দিয়েই অল্প সময়ে তিন উপজেলার মানুষ আসা-যাওয়া বেশি করে থাকে। কিন্তু সেতু না থাকায় হাজার হাজার যাত্রী নৌকাঘাটে এসে রোদ, বৃষ্টি উপেক্ষা করে নানা দুর্ভোগের শিকার হয়ে থাকেন। অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকার পর নৌকা ঘাটে ভিড়লে শুরু হয় নৌকায় ওঠার প্রতিযোগিতা। বড় ইঞ্জিন নৌকাগুলোয় যাত্রীদের সঙ্গে সিএনজি, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, গাদাগাদি করে বহন করা হয়। যানবাহন ওঠানামা করতেও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। এ ছাড়া নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো থেকে ধান, পাট, চাল, শাকসবজি মাছ ও অনন্যা পণ্য পারাপারে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পরিবহন খরচ হয় দ্বিগুণ। কাপাসহাটিয়া বাজারের দোকানদার হাবিবুর রহমান বলেন, এখানে সেতু না থাকায় আমরা অনেক পথ ঘুরে ধান-চালসহ বিভিন্ন পণ্য বেচতে জেলা শহরে নিতে হয়। কষ্ট যেমন হয়, খরচও বেশি লাগে।
নেত্রকোনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ আলনূর সালেহীন বলেন, প্রায় ২৭০ মিটার দৈর্ঘের সেতু নির্মাণ করতে হবে। এ জন্য জরিপসহ বেশ কিছু ধাপ সম্পন্ন করে নকশা করা হচ্ছে। এরপর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হবে। নেত্রকোনা-২ (নেত্রকোনা সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি ডা. মো. আনোয়ারুল হক বলেন, ওই এলাকায় কংস নদে সেতু না থাকায় পারাপারে মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেতু নির্মাণের জন্য জরিপ কাজ করেছে শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনাও হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে সেতু নির্মাণকাজ শুরু হবে।
- বিষয় :
- সেতু
