অকৃতকার্যের ভয় দেখিয়ে গাইড বেচাকেনা
সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৮:১৬ | আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ | ০৮:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরকার প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই তুলে দিচ্ছে। প্রাথমিক থেকে এসএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা যাতে অর্থের অভাবে পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে, সেটিই রাষ্ট্রের লক্ষ্য। অথচ বাস্তবে সরকারি বইয়ের বাইরেই গড়ে উঠেছে আরেকটি অদৃশ্য শিক্ষাব্যবস্থা– সহায়ক বইয়ের নামে গাইড, গ্রামার ও ব্যাকরণ বইয়ের বিশাল বাণিজ্য।
চারঘাট উপজেলায় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়ংকর এক চিত্র। শিক্ষক সমিতি, প্রকাশনী সংস্থা, কিছু শিক্ষক ও লাইব্রেরি মালিকদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয়, কম নম্বর দেওয়ার আশঙ্কা কিংবা প্রশ্ন কমন না পাওয়ার আতঙ্ক দেখিয়ে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার। একদিকে দরিদ্র অভিভাবকের ঋণের বোঝা, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি– সব মিলিয়ে শিক্ষা ধীরে ধীরে জ্ঞানের জায়গা থেকে সরে গিয়ে ব্যবসার পণ্যে পরিণত হচ্ছে।
বছরে সাড়ে ৫ কোটি টাকার বই বিক্রি
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চারঘাটে মাধ্যমিক ৫৮টি, মাদ্রাসা সাতটি ও কারিগরি ১৭টিসহ মোট ৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার।
সরেজমিন বিভিন্ন লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার ও সহায়ক বই মিলিয়ে প্রায় এক হাজার ৮০০ টাকার প্যাকেজ কিনতে হচ্ছে। নবম শ্রেণিতে সেই প্যাকেজের মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ৯০০ টাকা। শ্রেণিভেদে গড়ে তিন হাজার টাকা ধরে বছরে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার বই বিক্রি হচ্ছে শুধু চারঘাট উপজেলাতেই।
পিরোজপুর গ্রামের অভিভাবক আফরোজা বেগম বলেন, ‘সরকার বই ফ্রি দিচ্ছে, কিন্তু স্কুল আবার কয়েক হাজার টাকার বইয়ের তালিকা ধরিয়ে দিয়েছে। দুই মেয়ের বই কিনতে ঋণ করতে হয়েছে।’
‘নির্ধারিত বই না কিনলে প্রশ্ন কমন পাবে না’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিজেদের করার নিয়ম থাকলেও জনবল ও ব্যয়ের অজুহাতে অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে প্রশ্ন তৈরি করে। ফলে সমিতিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে একই ধরনের প্রশ্নপত্র ব্যবহার করা হয়।
উপজেলার ৫৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির দুই অংশে বিভক্ত। এর মধ্যে ৪৬টি বিদ্যালয়ের একটি অংশ শিক্ষার্থীদের ‘লেকচার পাবলিকেশন’-এর বই কিনতে বাধ্য করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের বলা হচ্ছে, সমিতির পরীক্ষার প্রশ্ন ওই প্রকাশনীর বই থেকেই করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষক সমিতির এক নেতা জানান, লেকচার পাবলিকেশনের সঙ্গে প্রায় ২৭ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। তবে শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘২৭ লাখ টাকার চুক্তির বিষয়টি গুজব। বইয়ের মান ভালো হওয়ায় সেগুলো পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’ একভাবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন লেকচার পাবলিকেশনের উপজেলার প্রতিনিধি রবিউল ইসলাম।
অপরদিকে, নয়টি বিদ্যালয় নিয়ে গঠিত আরেকটি সমিতি ‘অনুপম পাবলিকেশন’-এর বইয়ের তালিকা দিয়েছে শিক্ষার্থীদের। এ প্রকাশনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন বলেন, ‘আমরা কাউকে বই কিনতে বাধ্য করি না। শিক্ষকদের চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ করা হয়।’
ক্লাসে সরকারি বই নয়, চলে গাইড
চারঘাটের একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরদহ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়সহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। বছরের শুরুতে এক প্রকাশনীর বই কিনলেও পরে শিক্ষকদের চাপের মুখে আবার অন্য প্রকাশনীর বই কিনতে হয়। প্রশ্নও করা হয় এসব বই থেকে। শিক্ষক শামীম আলম চৌধুরী, মোজাফফর হোসেন, সাইফুল ইসলাম, সজীব আহমেদ ও নার্গিস আক্তার বানু পাঞ্জেরী প্রকাশনীর অক্ষরপত্র সিরিজের বই কিনতে চাপ দেন। তারা টিউশনিও করেন। শিক্ষকদের এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন শামীম আলম চৌধুরী।
অভিভাবক লালন আলী বলেন, ‘একবার বই কিনে দিয়েছি। এখন আবার নতুন সিরিজ কিনতে বলছে। ধারদেনা করে আবার বই কিনতে হয়েছে।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানায়, ‘স্যারদের কথামতো বই না কিনলে নম্বর কম দেওয়া হবে–এমন ভয় সবার মধ্যেই কাজ করে।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিক্ষক শামীম আলম চৌধুরী। তাঁর দাবি, ‘শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য সহায়ক বইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কাউকে বাধ্য করা হয়নি।’ অক্ষরপত্র সিরিজের বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগ আসার পর সেই বই কিনতে নিষেধ করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আজগর হোসেন বলেন, ‘প্রকাশনীগুলো সমিতির নেতাদের কমিশন দেয়। এরপর শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর বই চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন ওই বই থেকে হবে– এমন ধারণা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হচ্ছে।’
সরদহ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খাতুনে রাহে নাজাত বলেন, ‘শিক্ষকদের এ ধরনের পরামর্শ না দিতে বলা হয়েছে। এরপরও কেউ ব্যক্তিগতভাবে করলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।’
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
২০০৮ সালে উচ্চ আদালত নোট-গাইডনির্ভর শিক্ষা বন্ধে নির্দেশনা দেন। শিক্ষা আইনের খসড়াতেও শিক্ষার্থীদের বাণিজ্যিক বই কিনতে বাধ্য করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই আইন কার্যকর হচ্ছে না বলেই অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, ‘যখন শিক্ষক নিজেই নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই চাপিয়ে দেন, তখন শিক্ষা আর শিক্ষা থাকে না– এটা ব্যবসায় পরিণত হয়।’
সুজন চারঘাটের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি পাঠ্যবইয়ের বাইরে নির্দিষ্ট গাইড চাপিয়ে দেওয়া জাতীয় শিক্ষানীতির পরিপন্থি এবং এটি শিক্ষাকে বাণিজ্যিকনির্ভর করে তুলছে। এভাবে ভয় দেখিয়ে বই কিনতে বাধ্য করানো অনৈতিক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধও। এতে সবচেয়ে বেশি ভুগছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার।’
উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার রাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় বই বিনামূল্যে দিচ্ছে। বই নিয়ে বাণিজ্যের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. রাহাতুল করিম মিজান বলেন, ‘সরকারি বইয়ের বাইরে নির্দিষ্ট বই নিয়ে বাণিজ্য অনৈতিক। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- বই
