বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে কৃষিজমি
উর্বরাশক্তি হারিয়ে যাবে জেনেও একটি চক্র অবাধে কেটে নিচ্ছে ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি। সম্প্রতি দেওয়ানগঞ্জের ডাংধরা ইউনিয়নের বাঘারচর থেকে তোলা -সমকাল
রাজ্জাক মিকা, দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর)
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেওয়ানগঞ্জে চলছে ফসলি জমি থেকে মাটি উত্তোলন। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মাটি কাটায় বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে কৃষিজমি। সম্প্রতি একটি সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও থামছেই না মাটি কাটা।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলাটি নদীবিধৌত। বন্যায় এই অঞ্চলের বেশির ভাগ ফসলি জমির উপরিভাগে পলি জমে। সে কারণে এই অঞ্চলে ধান, পাট, ভুট্টা ও আখ বেশি হয়। উপজেলা সদরের আশপাশের অঞ্চলগুলো ব্যতীত চর আমখাওয়া, পাররামরামপুর ও ডাংধরা ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে ফসলি জমির মাটি উত্তোলনের একটি বিশেষ চক্র। তারা জমির মালিকদের কাছ থেকে স্বল্পমূলে উপরিভাগের মাটি কিনে নিয়ে বিক্রি করছে চড়া দরে। এই মাটি যাচ্ছে বসতভিটা উঁচুকরণের কাজে।
স্থানীয়রা জানান, কিছু দিন আগে ডাংধরা ইউনিয়নের গোয়ালকান্দা গ্রামের জিঞ্জিরাম নদের তীরবর্তী এলাকার ফসলি জমির মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। উপরিভাগের মাটি কাটায় উর্বরাশক্তি হারিয়ে অনেকটা ফসল চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এসব জমি। বর্তমানে চলছে ওই ইউনিয়নের বাঘারচর সরকারপাড়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কাটার ধুম। এই কাজে ব্যবহার হচ্ছে কয়েকটি ভেকু ও প্রায় ৩০টি ট্রাক্টর। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয় মাটি কাটা। শেষ হয় রাতে। প্রতিদিন কয়েকশ টন মাটি বেচাকেনার এক মহাযজ্ঞ চলছে এই অঞ্চলে।
সরেজমিন দেখা গেছে, বাঘারচর সরকারপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তর পাশ সংলগ্ন হাইওয়ে সড়ক থেকে একটি মাটির পথ চলে গেছে পূর্ব দিকে। কয়েকশ গজ পূর্ব দিকে একটি নিভৃত কৃষি জমিতে বসানো হয়েছে তিনটি ভেকু। চলার পথে চোখে পড়ে ২০টির মতো ট্রাক্টর। ট্রাক্টরগুলো মাটি পরিবহনের কাজে ন্যস্ত। কাছে গিয়ে দেখা যায়, জমিতে ছিল ভুট্টা। পরে পাট বপন করা হয়েছে। পাটের গাছ লকলক করে রোদ-বৃষ্টিতে বেড়ে উঠছে। ভেকু তিনটি সেই পাট ভেঙে ওই জমিগুলোর উপরিভাগের উর্বর মাটি তুলছে।
ভেকু ও ট্রাক্টর চালকরা জানেন, এই জমির উপরিভাগের মাটি উত্তোলনের ফলে পরিবেশ ও কৃষিতে বিপর্যয় ঘটছে। জমির মালিকরা তা জেনেও এই মাটি বিক্রি করছেন। মাটি ব্যবসায়ী চক্রটি প্রভাবশালী। তারা দেদার মাটি তুলে বিক্রি করছে অন্যত্র।
স্থানীয় রবিউল ইসলাম জানান, এর আগে দীর্ঘদিন ভেকুগুলো চলত গোয়াল কান্দায়। সেখানকার জমিগুলো এখন জীর্ণদেহী। চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলি জমিগুলো। এখন এই ভেকুগুলো বাঘারচর সরকারপাড়ার ফসলি জমিতে নেমেছে। ভেকু চালকরা জমি মালিকদের নয়ছয় বুঝিয়ে কোনো রকম মূল্যে উর্বব মাটি কিনে নিয়ে যাচ্ছে। বিক্রি করছে অন্যত্র। এতে মাটি ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকার ফসলি জমি। বিপর্যয় ঘটছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও কৃষি খাতের। প্রশাসনের কাছে দ্রুত প্রতিকার চান তিনি।
বাঘারচর মধ্যপাড়া গ্রামের মাসুদ জানান, এলাকার কৃষিজমিতে তিনটি ভেকু বসিয়ে দেদার মাটি তুলছে। তারা বাধা দিচ্ছেন, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। ভেকু মালিকরা পেশি শক্তির বলে জোর করে মাটি কাটছেন। তিনি দ্রুত এর প্রতিকার চান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজনের ভাষ্য, ভেকু মালিকরা প্রভাবশালী। তাদের উপরে হাত রয়েছে। সে কারণে তারা কোনো কিছুতেই তোয়াক্কা করছেন না। প্রশাসনের কথা বললে তারা জানান, প্রশাসন কী করবে, জমির মালিকরা মাটি বিক্রি করছে। মাটি না কাটতে পারলে ভেকু তৈরি করেছে কেন? এলাকাবাসী ভেকু মালিকদের শক্তির কাছে দুর্বল। ভেকু দিয়ে ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন তারা।
আমিনুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম নামে দুই ব্যক্তি মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে বক্তব্য জানতে তাদের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ জহুরুল হোসেন জানান, অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- কৃষিজমির মালিক
