আশ্বাসই সাড়, ৩০ বছরেও মেলেনি পুনর্বাসনের সুযোগ
দুর্ঘটনায় আহত ইদ্রিস আলী সমকাল
নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
তখন দেশজুড়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোল। নির্বাচনের আগে একটি জনসভা আয়োজন করে বিএনপি। নির্ধারিত দিনে দলে দলে জনসভায় আসতে থাকেন নেতাকর্মীরা। এ জনসভায় যোগ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণ হারান ২৪ জন, আহত হন অন্তত ৩৪ জন। আহতদের অনেকেই পঙ্গু হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। প্রায় ৩০ বছর আগের সেই ঘটনার কথা মনে হলে এখনও আঁতকে ওঠেন আহতরা। কিন্তু আজও ক্ষতিপূরণ মেলেনি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পাওয়া না পাওয়ার কথাগুলো বলতে ব্যাকুল তারা।
১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন মরহুম খুররম খান চৌধুরী। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে ১ জুন বিকেলে মোয়াজ্জেমপুর গ্রামে প্রার্থীর বাড়ির প্রাঙ্গণে এক নির্বাচনী জনসভার আয়োজন করা হয়। দলটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদার জনসভায় উপস্থিত থাকবেন বলে প্রচার চালানো হয়। নির্ধারিত দিন দুপুর থেকেই দলে দলে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা জনসভাস্থলে পৌঁছাতে শুরু করেন। সিংরইল ইউনিয়নের উদং মধুপুর বাজার থেকেও দুটি বাস বোঝাই করে কর্মী-সমর্থকরা জনসভার উদ্দেশে রওনা দেন। দুপুরের দিকে বাস দুটি জনসভাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছার পর পেছনের বাসের ছাদে থাকা লোকজন রাস্তার পাশের ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এতে পুরো বাসটি বিদ্যুতায়িত হয়ে ২৪ জনের মৃত্যু হয়। এতে আহত হন ৩৪ জন, যাদের অনেকেই হাত-পা, চোখ হারিয়ে পঙ্গু হয়ে যান। হতাহতদের অধিকাংশের বাড়ি সিংরইল ইউনিয়নের উদং মধুপুর গ্রামে।
ওই নির্বাচনে খুররম খান চৌধুরী পরাজিত হন এবং আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়। পরে খুররম খান চৌধুরী ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থানীয় শিয়ালধরা বাজারের পাশে নিহত ২৪ এবং আহত ৩৪ জনের নাম-ঠিকানা সংবলিত ‘স্মৃতি মর্মর’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। ২০০০ সালের ২৮ আগস্ট স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এছাড়া হতাহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তাদের সান্ত্বনা দেন। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে ১০ হাজার করে এবং আহতদের পরিবারকে ৫ হাজার করে অর্থ সহায়তা দেন। এছাড়া ১২টি পরিবারকে ১টি করে রিকশা দেন। আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে হতাহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুনর্বাসন করার আশ্বাস দেন। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসন করা হয়নি।
পুনরায় দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে বিএনপি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরতে চান ক্ষতিগ্রস্তরা।
গত সোমবার সন্ধ্যায় শিয়ালধরা বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, স্মৃতিস্তম্ভের পাশে মসজিদে নিহতদের স্মরণে স্থানীয়দের উদ্যোগে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এ সময় একটি দোকানে বসে কথা হয় স্থানীয় উদং মধুপুর গ্রামের মামুন অর রশীদ ওয়াসিমের সঙ্গে। তিনি তখন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা হারুন অর রশীদের সঙ্গে ওই বাসে করে জনসভায় যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা মারা গেলেও তিনি কিভাবে বেঁচেছিলেন তা বলতে পারেন না। ওয়াসিমের ভাই স্থানীয় একটি কলেজের শিক্ষক টিপু সুলতান জানান, ওইদিনের দুর্ঘটনায় তিনি আহত হলেও তাঁর বাবা হারুন অর রশীদ ও চাচা আব্দুল মন্নাছ মারা যান।
তারা মিয়া জানান, ওই বাসের যাত্রী হয়ে তিনি বেঁচে গেলেও তাঁর বড় ভাই আবু বকর ছিদ্দিক মারা গেছেন। রাজন মিয়া জানান, তাঁর বাবা শাহাবুদ্দিন ভূঁইয়া আহত হয়ে পরে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান। এরপর তারা নগদ ১০ হাজার টাকা ও একটি করে শাড়ি কাপড় ছাড়া আর কিছইু পাননি। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাদের দীর্ঘদিন দুঃখ-কষ্টে দিন কেটেছে।
ফোনে যোগাযোগ করলে আহত ইদ্রিস আলী বলেন, মারাত্মক আহত হলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ছয় দিন পর তাঁর দুটি পা উরু থেকে কেটে ফেলা হয়। বাড়িতে থাকার মতো ঘর না থাকায় বর্তমানে তিনি ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ঢাকায় আছেন। তিনি জানান, ঘটনার পর মাত্র ১০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পরবর্তীতে দল ক্ষমতায় এলে আর্থিক সহায়তা দিয়ে পুনর্বাসন করা হবে। বর্তমানে তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরে সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ এবং সহায়তা চান।
দুর্ঘটনায় এক পা হারানো আচারগাঁওয়ের আরজু মিয়া জানান, বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এখানে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। এখন তাঁর ছেলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে দেখা করে সেই কথাগুলো বলতে চান তারা।
সিংরইল ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ঘটনাস্থলে এসে ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসন করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তাঁরই সন্তান। তিনি এখানে এসে হোক বা না এসে হোক তাদের পুনর্বাসন করার দায়িত্ব তাঁরই নিতে হবে।
ময়মনসিংহ জেলা উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক এনায়েতুল্লাহ খানের ভাষ্য, বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। নান্দাইল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ইয়াসের খান চৌধুরী বর্তমানে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী। এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন বলে মনে করছেন তিনি।
- বিষয় :
- দুর্ঘটনা
