মাইকিং করে ১৪৪ ধারা ভেঙে সংঘর্ষে জড়াল দুই গ্রামের বাসিন্দারা
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার জগৎকুড়া গ্রামে বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয় প্রতিপক্ষ। আগুন নেভাতে কাজ করছেন দমকলকর্মী সমকাল
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দোকানে বাকি খাওয়া নিয়ে দুই গ্রামের কয়েকজন যুবকের কথাকাটাকাটির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। গত এপ্রিল মাসের এ ঘটনার জেরে গত বৃহস্পতিবার ফের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে গ্রাম দুটির বাসিন্দারা। সংঘর্ষে একজন নিহত হলে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে দিনভর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও থেমে থেমে সংঘর্ষে লিপ্ত হন তারা।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার জগৎকুড়া ও গোপালপুর উপজেলার গুলিপেচা গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে এই বিবাদ চলছে। তবে গতকালের সংঘর্ষে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে হামলা-সংঘর্ষে জগৎকুড়া গ্রামের কালাম তালুকদার নিহত হন। এরপর সন্ধ্যায় গুলিপেচা গ্রামের দুই যুবক অটোরিকশায় চড়ে মাইকিং করে তাদের গ্রামের লোকজনকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গতকাল শুক্রবার সকাল ৭টায় নলিন বাজারে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানায়। এই ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঘটনাস্থলের ২০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করেন। গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টা থেকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ওই স্থানে সভা-সমাবেশ, দলবদ্ধ চলাফেরা নিষিদ্ধ করা হয়। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শুক্রবার সকালে গুলিপেচা গ্রামের কয়েকশো লোক অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোঁঠা নিয়ে জগৎকুড়া গ্রামে হামলা চালায়। জগৎকুড়া গ্রামের লোকজন প্রতিরোধ করে। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এর মধ্যেই জগৎকুড়া গ্রামের ১০ থেকে ১২টি বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। খবর পেয়ে গোপালপুর ও ভূঞাপুর থেকে দমকল বাহিনী গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। দুই থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। তবে দুই গ্রামের মারমুখী মানুষের মধ্যে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন পুলিশ সদস্যরা।
ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব হাসান জানান, নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা সৃষ্টি হয়েছে। সংঘর্ষটি দুটি গ্রামের মানুষের মধ্যে হলেও এখন আর দুই গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এই সংঘর্ষে ছোট ছোট কিশোর ও তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সঙ্গে নিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন তারা। তবে সহস্রাধিক লোকজনকে সামান্য কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই দুরূহ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, জগৎকুড়া গ্রামের বাসিন্দা শাকিলের একটি দোকান রয়েছে নলিন বাজারে। এই দোকানে বাকি খাওয়া নিয়ে গত এপ্রিল মাসে গুলিপেচা ও জগৎকুড়ার কয়েকজন যুবকের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। এই ঘটনা মীমাংসা করতে গত ২২ এপ্রিল সালিশ বৈঠক বসে। সালিশ বৈঠক চলার একপর্যায়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে। অজুর্না ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নিয়ামত মাস্টারকে মারপিট করা হয়। এরপর জগৎকুড়ার লোকজন গুলিপেচা গ্রামে ঢুকে লোকজনকে মারধর, কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এরই ধাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার বিকেলে গুলিপেচা গ্রামের বাসিন্দারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জগৎকুড়া গ্রামে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। সংঘর্ষে জগৎকুড়া গ্রামের কালাম তালুকদারসহ অনেকেই আহত হন। পরে তাদের ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কালামকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক ফাতেমা।
জগৎকুড়া গ্রামের রবিউল ইসলাম জানান, গুলিপেচা গ্রামের লোকজন মাইকিং করে হামলা চালিয়েছে। পুলিশ কোনো কিছুই করতে পারেনি। এর আগেও তারা হামালা চালিয়ে একজনকে হত্যা করেছে। জনপ্রতিনিধিদের উদাসীনতার কারণে এতবড় ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে।
সোহেল খান নামে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা জানান, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। কেউ কোনো কথা শুনছে না। বিএনপির কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আওয়ামী লীগের লোকজনও ঢুকে পড়েছে এই সংঘর্ষে। তাদের অনেকেই ইন্ধন দিচ্ছে। এখানে প্রশাসনেরও দায় আছে।
গোপালপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, দেড় মাস আগে নলিন বাজারে শাকিল নামে এক ব্যক্তির দোকানে বাকি খাওয়াকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। শাকিলের বাড়ি জগৎকুড়া গ্রামে। এই ঘটনা নিয়ে পরে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। গতকাল শুক্রবারও হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। এখন পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন রয়েছে।
ভূঞাপুর থানার ওসি সাব্বির রহমানের ভাষ্য, সংঘর্ষে নিহত কালামের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে এখনও টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এখনও কোনো মামলা হয়নি।
পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার বলেন, শত্রুতার জের ধরে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
- বিষয় :
- ১৪৪ ধারা
