ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

যৌথ অভিযান

খুলনায় ১৮১ সন্ত্রাসীর তালিকা, গডফাদারদের নাম নেই

তিন দিনের অভিযানে গ্রেপ্তার ১২৯, তালিকাভুক্ত মাত্র দুজন

খুলনায় ১৮১ সন্ত্রাসীর তালিকা, গডফাদারদের নাম নেই
×

লিটন, রিফাত

 হাসান হিমালয়, খুলনা 

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনায় প্রায়ই প্রকাশ্যে খুনের পাশাপাশি গুলি ও কুপিয়ে জখমের ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে মহানগরীতে খুন হয়েছেন ১৬ জন। দিনদুপুরে খুন করে বীরদর্পে চলে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। এই প্রেক্ষাপটে মহানগরীর আটটি থানায় সন্ত্রাসীদের নতুন তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ। এ সংখ্যা ১৮১ বলে পুলিশ জানিয়েছে। এর মধ্যে গত তিন দিনের অভিযানে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তালিকায় সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদারদের নাম নেই। 

এদিকে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে ২ জুন রাতে যৌথ অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত তিন দিনে মাদক বিক্রেতাসহ ১২৯ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে তালিকাভুক্ত দুজন হলেন কসাই লিটন ও আজম খান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ছিল পুলিশ। এই সুযোগে এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাং মাথাচাড়া দেয়। আধিপত্য ও মাদক বিক্রি নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। দিনদুপুরে চলে খুনখারাবি, গুলি ও কুপিয়ে জখমের ঘটনা।

খুলনা মহানগর পুলিশের অপরাধ শাখার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ২২ মাসে ৮৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত। এ প্রেক্ষাপটে থানাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের নতুন তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়।

সদর থানা 
সদর থানা এলাকার ২৭ সন্ত্রাসী পুলিশের তালিকায় রয়েছে। এ তালিকার ১ নম্বরে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নাম। ১৪টি মামলার আসামি বাবুর বিরুদ্ধে ১১টি মামলা বিচারাধীন। দুটি মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। একটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজা নিয়ে এখন পলাতক। তিনি কোথায় আছেন, এ বিষয়ে পুলিশের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। 
পুলিশের সূত্র বলছে, লাপাত্তা গ্রেনেড বাবুর অনুসারীরা নানা অপরাধে সক্রিয়। তাঁর হয়ে সদর থানা এলাকায় ২৯ জন, লবণচরায় ছয়জন, সোনাডাঙ্গায় ৯ জন এবং হরিণটানা থানা এলাকায় তিনজন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও মাদক ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ করেন। 

সদর থানার তালিকার দুই নম্বরে রয়েছে নূর আজিমের নাম। তাঁর বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা আছে। এর মধ্যে পাঁচটিতে খালাস পেয়েছেন। ১০টি মামলা বিচারাধীন। একটি অস্ত্র মামলায় সাজা খাটছেন কারাগারে। অনুসারীদের মাধ্যমে চাঁদাবাজিসহ অপরাধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সদর থানা এলাকার তালিকাভুক্ত ২৭ জন সন্ত্রাসীর মধ্যে পলাশ শেখ, আশিক, বিসমিল্লাহ, সজীব, গলাকাটা রাজু, ঠুন্ডা শামীম, সৌরভ সাহা জনি, ফয়সাল খান অন্যতম।

সোনাডাঙ্গা থানা
পুলিশের তালিকায় নগরীর সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় ২১ জন সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে সাগর বিশ্বাস ওরফে হাড্ডি সাগর, শামীম কাজী ওরফে ঢাকাইয়্যা শামীম, রুবেল ইসলাম লাভলু ওরফে কালা লাভলু, সৌরভ গাজী, চিংড়ি পলাশ, ইনশান শরীফ, কালা তুহিন, রাজু ওরফে ব্ল্যাক রাজু, আলী নূর ডাবলু, রনি শেখ ওরফে কাবা, ইনসান শরীফ অন্যতম।

দৌলতপুর থানা
দৌলতপুর থানা এলাকার ৩১ সন্ত্রাসীর মধ্যে ইমন হাওলাদার, আসিফ মোল্লা, আসলাম ওরফে টেরা আসলাম, আরমান, হুমায়ুন কবির হুমা, মমি, আজম শেখ, এলকো রিপন, মিল্লাত গাজী, রায়হান, ইসতিয়াক ওরফে শাহরিয়ার, হাফিজুল অন্যতম।
 
খালিশপুর থানা
খালিশপুর থানার ৩৬ সন্ত্রাসীর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ট্যাংকি শাওনের নাম। তালিকাভুক্ত অন্যদের মধ্যে পলাশ হাওলাদার, ওয়াজিব ইসলাম রাকিব, নয়ন, সাঈদ, নবাব অন্যতম।
 
আড়ংঘাটা থানা
আড়ংঘাটা থানার ১৫ সন্ত্রাসীর তালিকায় রয়েছেন হোসেন ঢালী, জুয়েল সরদার, রানা শেখ, সুজন সরকার, ছোট শাহীন, হরিণটানা থানার আজম তালুকদার, দেলোয়ার হোসেন, ইমাদ মোল্লা ও বিল্লাহ ওরফে বিল্লু। খানজাহান আলী থানার তালিকায় রয়েছে জাফরিন ও জাহিদুল ইসলাম লাল্টুর নাম।  

লবণচরা থানা
নগরীর লবণচরা থানায় সর্বোচ্চ ৪৫ জন সন্ত্রাসীর নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মিরাজ হোসেন ওরফে কাউয়া মিরাজ, আরিফুজ্জামান রাজ, মামুন ওরফে হাসিব হোসেন, সোহেল মিনা ওরফে পালসার সোহেল, ইমন, সবুজ সানা, সুমন ওরফে ব্লেড বাবু, সবুজ সানা ওরফে মোটা সবুজ অন্যতম।

হরিণটানা ও খানজাহান আলী থানা
হরিণটানা থানার তালিকাভুক্ত চার সন্ত্রাসী হচ্ছেন আজম তালুকদার, দেলোয়ার হোসেন, ইমাদ মোল্লা, বিল্লাহ ওরফে বিল্লু এবং খানজাহান আলী থানার তালিকাভুক্ত দুজন হলেন জাফরিন ও জাহিদুল ইসলাম লাল্টু।

সন্ত্রাসীদের ছবিসহ ডেটাবেজ তৈরি
তালিকা তৈরির কাজ মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা খুলনা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার রাশিদুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, পুলিশের কাছে এসব সন্ত্রাসীর ছবি, পূর্ণাঙ্গ নাম, ঠিকানা বা কোনো ধরনের তথ্য ছিল না। তাদের ছবিসহ ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এখন তাদের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা, মামলার বিবরণসহ যাবতীয় তথ্য রয়েছে। তালিকা তৈরির পরই অভিযান শুরু হয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকবে।
 
গডফাদারদেরও শনাক্ত করবে পুলিশ  
খুলনায় সন্ত্রাসীদের কাছে কারা অস্ত্র সরবরাহ করে, দামি মোটরসাইকেল এবং অর্থের জোগানদাতা এমন গডফাদারদের নাম তালিকায় নেই। 
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত কমিশনার রাশিদুল ইসলাম খান বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের নামের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এটা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা হবে, তখন তাদের অস্ত্র সরবরাহকারী বা অন্যান্য কাজে জড়িত ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করবে পুলিশ।

যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার ১২৯
খুলনা মহানগর পুলিশ ২ জুন রাতে যৌথ অভিযান শুরু করে ৩ তারিখ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন মহানগর পুলিশের সদরদপ্তরে বিশেষ সভা ডেকে এই কাজে র‌্যাব, এপিবিএন, গোয়েন্দা বিভাগকেও সম্পৃক্ত করা হয়। তাদের কাছে সন্ত্রাসীদের তালিকাও সরবরাহ করা হয়েছে। ৪ তারিখ ৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল শুক্রবার ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী দুজন। তারা হলেন কসাই লিটন ও আজম খান। 

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, খুলনা এখন আতঙ্কের শহর। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও থেকে গোলাগুলি, চাঁদাবাজি, অপহরণের তথ্য আসে। সন্ত্রাসীদের দমনে খুলনায় পুলিশের আরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন। 

মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রথম দিনের অভিযানে গ্রেনেড বাবুর সহযোগীসহ চারজনকে এবং রাশেদ হত্যা মামলার তিন আসামি, পরদিন মাদক বিক্রেতা আজমসহ ৭৬ জনকে এবং গতকাল গ্রেনেড বাবুর আরেক সহযোগী কসাই লিটনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও গ্রেপ্তার হবে।
জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদদের ইতিবাচক প্রচার চালানো প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ পুলিশকে সহযোগিতা করতে চায় না, মামলায় সাক্ষ্য দেয় না। অসহযোগিতা করলে পুলিশের পক্ষে সব নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।

 

আরও পড়ুন

×