ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

পাহাড় ধস ট্র্যাজেডির ৯ বছর

এখনও ঝুঁকি নিয়ে বাস ২০ সহস্রাধিক মানুষের

এখনও ঝুঁকি নিয়ে বাস  ২০ সহস্রাধিক মানুষের
×

রাঙামাটিতে পাহাড়ের পাদদেশে এভাবেই তৈরি করা হয়েছে বসতি। গতকাল শুক্রবার শহরের ভেদভেদি লোকনাথ মন্দির এলাকায় সমকাল

সত্রং চাকমা, রাঙামাটি 

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের ভয়াবহ ঘটনার ৯ বছর পূর্তিতে দেখা গেল, সেসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানেই পুনরায় বসতি গড়ে বাস করছে কয়েক হাজার মানুষ। প্রশাসনের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে বসবাসকারীদের সরিয়ে ফেললেও পরে আবারও চলে আসে তারা। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নতুন স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞাও মানা হচ্ছে না।   

২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটিতে অতিবৃষ্টিতে ভয়াবহ পাহাড়ধস হয়। এতে রাঙামাটি শহরের ভেদভেদীর যুব উন্নয়ন বোর্ড এলাকা, মুসলিম পাড়া, শিমুলতলী, রূপনগর, সাপছড়ি, মগবান, বালুখালী এবং জুরাছড়ি, কাপ্তাই, কাউখালী ও বিলাইছড়ি এলাকায় পাঁচ সেনা সদস্যসহ ১২০ জনের প্রাণহানি হয়। শহরের মানিকছড়িতে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক থেকে মাটি সরাতে গিয়ে ওই পাঁচ সেনা সদস্য পাহাড় ধসে মারা যান। ২০১৮ সালে নানিয়ারচর উপজেলায় পাহাড় ধসে দুই শিশুসহ ১১ জন এবং ২০১৯ সালে কাপ্তাইয়ে তিনজনের প্রাণহানি ঘটে। এত মৃত্যুর মিছিলের পরও ঝুঁকিতে থাকা এসব মানুষের কোনো পুনর্বাসন হয়নি।  
সূত্র জানায়, রাঙামাটি পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে শিমুলতলী, রূপনগর, লোকমন্দির পাড়া, পোস্ট অফিস কলোনি এলাকা, নতুন পাড়া, বিদ্যানগর, কিনারাম পাড়া, সিলেটি পাড়াসহ অন্তত ২৯টি স্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া, নানিয়ারচর, কাউখালী উপজেলাসহ কয়েকটি উপজেলায় পাহাড়ের পাদদেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন ২০ হাজারের অধিক লোকজন।  
গতকাল শুক্রবার পাহাড় ধসের ট্রাজেডির ঘটনাস্থল রূপনগর, শিমুলতলী, নতুন পাড়ায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ঝুঁকি সত্ত্বেও পাহাড়ের পাদদেশের ভাঁজে ভাঁজে নতুন ঘর নির্মাণ থেমে নেই। 

মাথা গোঁজার ঠাঁই চান তারা
নতুন পাড়ার সুমন পারভেজ ও মো. হারুন বলেন, ‘বৃষ্টিবাদলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হচ্ছে।’ যেহেতু তারা গরিব, তাই অল্প টাকায় যেখানে জায়গা কেনা গেছে সেখানেই বসবাস করছেন। রূপনগরের লতিফা খাতুন, মনি আক্তার চম্পা, জহরা বেগম জানান, ‘২০১৭ সালের ১৩ জুনের কথা মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। কিন্তু কী করার আছে? অন্যত্র যাওয়ার জায়গা নেই। বৃষ্টি হলে ছেলেমেয়ে নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। এতটা কষ্টের মধ্যে আছি তা বলার ভাষা নেই।’ তারা আরও বলেন, ‘আমরা যেহেতু গরিব, তাই এভাবেই পাহাড়ে বসবাস করতে হচ্ছে। এতে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। দেশের বাইরে থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে সরকার আশ্রয় দিতে পারে। আমরা কী অপরাধ করেছি? আমরা পরিবার, ছেলেমেয়ে নিয়ে নিরাপদে মাথা গোঁজার ঠাঁই চাইছি। সরকারের কাছে দাবি, নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানে নিয়ে পুনর্বাসন করা হোক।’  

পাহাড়ধসে মা-বাবা হারানো মিম-সুমাইয়া 
২০১৭ সালের ১৩ জুন রূপনগর এলাকায় পাহাড় ধসে বাবা সালাহ উদ্দীন ও মা রহিমা বেগম নিখোঁজ হন। বেঁচে যায় দুই বোন সুমাইয়া ও মিম। পরে অনাথ দুই বোনের দায়িত্ব নেন তাদের চাচা কাউছার। চাচার আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে জেলা প্রশাসন দুই বোনের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেন। মিম এখন অষ্টম শ্রেণি আর সুমাইয়া চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। চাচা কাউছার বলেন, ‘আগে দুজনে আমার কাছে ছিল। এখন তারা আমার মায়ের সঙ্গে লংগদুতে থেকে লেখাপড়া করছে। জেলা প্রশাসন থেকে প্রতিমাসে দশ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। তবে দুই বোন বড় হচ্ছে, এ টাকা দিয়েও তাদের ভরণপোষণে কষ্ট হচ্ছে।’   
জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি বলেন, ‘কিছুদিন আগে কয়েক দফা বৃষ্টির কারণে যারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে তাদের সতর্ক করে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে মাইকিং করে অনুরোধ জানানো হয়েছে। দুর্গম উপজেলা থেকে সবাই শহরের মধ্যে এসে বসবাস করতে চায়। দেখা গেছে, তারা খাস জায়গা বা পাহাড়ের পাদদেশ বেছে নেয় অথবা রাস্তার পাশে বসবাস করে তখন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, রাঙামাটি জেলায় প্রকৃতিগতভাবে বসবাসযোগ্য ভূমির পরিমাণ কম। আমরা অনেককে সরিয়ে ফেললেও শুষ্ক মৌসুমে আবার সেখানে তারা চলে আসে। 

আরও পড়ুন

×