ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

কুষ্টিয়ার খাজানগর

খালের পানিতে ছাইয়ের আস্তর

খালের পানিতে ছাইয়ের আস্তর
×

অটো রাইস মিলের গরম পানি ও ছাইয়ের কারণে খালে ছড়িয়ে পড়া দূষণ। সম্প্রতি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাজানগর এলাকায় সমকাল

সাজ্জাদ রানা, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৮:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের শাখা ও উপশাখার যে টলমলে পানিতে এক সময় চাষাবাদ করে ফসল ফলাতেন কুষ্টিয়ার চাষিরা, সেই খালই এখন কিছু এলাকার কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অটো রাইস মিল থেকে সরাসরি ফেলা বিষাক্ত গরম পানি ও বর্জ্যের কারণে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন কৃষকরা। 

জিকে প্রকল্প ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বারবার তাগদা দিলেও তা আমলে নিচ্ছেন না সদর উপজেলার খাজানগরের প্রভাবশালী মিল মালিকরা।
সদর উপজেলার খাজানগরের বিশাল এলাকা ও পাশের মিরপুর উপজেলার কিছু অংশে গড়ে উঠেছে চালকল। এর মধ্যে ম্যানুয়াল (হাসকিং) চালকলের পাশাপাশি রয়েছে অর্ধশত অটোমিল। খাজানগর এলাকা দিয়ে প্রবাহিত জিকে খালের দুই পাড়েই গড়ে উঠেছে এসব কারখানা। 
অটো রাইস মিল স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার নিয়ম থাকলেও এসব মানছেন না মিল মালিকরা। প্রতিদিন ধান থেকে চাল প্রক্রিয়াজাত করার সময় অটোমিলের বয়লারে বিপুল পরিমাণ পানি গরম হয়। এ পানি কারখানার ভেতরে গর্ত করে সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে। পাশাপাশি ছাই যেন না উড়ে, সে জন্য চিমনিতে আলাদা যন্ত্র বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা প্রতিটি কারখানার জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু বেশির ভাগ কারখানায়ই এসব মানা হয় না।

সম্প্রতি খাজানগরে গিয়ে জানা যায়, এ এলাকা দিয়ে জিকে প্রকল্পের সেকেন্ডারি (শাখা খাল) ও টারশিয়ারি (উপ-শাখা) খাল প্রবাহিত হয়েছে। এলাকার প্রভাতি রাইস মিলের সামনে থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন গঙ্গা-কপোতাঙ্গ (জিকে) সেচ প্রকল্পের দুটি খাল শুরু হয়ে লোকালয়ের দিকে গেছে। উৎপত্তিস্থল থেকেই অটো রাইস মিলের বর্জ্য আর দূষিত পানিতে খালের চিরচেনা দৃশ্যই যেন উধাও। বিষাক্ত পানি আর ছাইয়ে ভরে আছে খাল। কোনো কোনো জায়গায় ছাইয়ের কারণে পানি প্রবাহ বন্ধ। পুরো এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ।

খালের দুই পাড়ে বসবাসকারী বেশির ভাগ মানুষই মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র। কিছু দোকানপাট ও প্রতিষ্ঠান দেখা গেছে। খালের পাড়ে ঘাস কাটতে আসা আকরাম হোসেন বলেন, পুরো খালের অস্তিত্ব এখন বিলীন। অটোমিলের ছাই গিলে খাচ্ছে খাল দুটিকে। এ সময় খালে মাছ ধরতো লোকজন, গোসল করতো। এখন ভয়ে কেউ নামে না।
এর কারণ জানালেন এক গৃহিণী। তিনি বলেন, খালের পানি বিষাক্ত। কিছু আগেও গরু-ছাগলের গোসল করানো যেত। এখন নামলেই শরীর চুলকায়। পানির রং কালো। ছাইয়ের কারণে পানি চলাচল পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। আর গন্ধ তো মারাত্মক!
প্রভাতি রাইস মিলের পাশাপাশি হযরত আলী অটো রাইস মিল, প্রগতি রাইস মিল, নুর অটো রাইস মিল, মিয়া ভাই অটো রাইস মিল, দাদা রাইস মিল, সততা রাইস মিলসহ এক ডজন প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়েছে খালের পাড়ে।

এ খালের পানি দিয়ে বছরের পর বছর ধরে কয়েকটি গ্রামের মানুষ ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদ করে আসছিলেন। কিন্তু গত ৪-৫ বছর ধরেই সেই ধারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খালের দূষিত পানি সরু নালা দিয়ে মাঠে ঢুকছে। এতে করে ফসলের রোগ-বালাই বেড়েছে বলে জানান কৃষকেরা। 
পাশাপাশি জমি আছে এলাকার কৃষক আশরাফুল হক ও সিরাজুল ইসলামের। তারা জানালেন, আগে জিকে খালের পানি দিয়ে আবাদ করে ধানসহ অন্যান্য ফসল ঘরে তুলতেন। বছরে বিঘায় খরচ হতো মাত্র ২০০ টাকা। এখন বিষাক্ত পানি ঢুকে বলে গাছ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গোড়ায় পচন ধরছে। উৎপাদন কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। শ্যালো মেশিন বসিয়ে চাষাবাদ করছে। এতে খরচ বাড়ছে।
এসব অভিযোগ স্বীকার করে চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মিয়া অটো রাইস মিলের মালিক জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন, খাজানগর এলাকাজুড়ে রাইস মিল গড়ে উঠেছে। এখন মিল সরিয়ে নেওয়ার জায়গা নেই। শুধু মিল মালিকদের দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। তাই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
এসব বিষয় সমাধান করার জন্য জিকে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলে জানান পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী রশিদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মিল মালিকদের তালিকা করে আমরা চিঠি ইস্যু করেছি। বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানিয়েছি।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগও এ সংকটের সমাধান আনতে পারেনি। কয়েকবার অভিযান চালিয়ে জরিমানা করার পাশাপাশি মিলগুলো পরিবেশবান্ধব করার জন্য তাগাদা দেন দপ্তরের কর্মকর্তারা। তবে অনেক মিল মালিক তাতে কর্ণপাত করছে না– এমন অভিযোগ কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এমদাদুল হকের। তিনি বলেন, কয়েক বার অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আইন মান্য করাতে চূড়ান্ত চিঠি দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×