ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

বাগেরহাট

জনসমক্ষে শিশুকে ডেকে ধর্ষণচেষ্টার বর্ণনা জানতে চান ওলামা দল নেতা

জনসমক্ষে শিশুকে ডেকে ধর্ষণচেষ্টার বর্ণনা জানতে চান ওলামা দল নেতা
×

ধর্ষণ চেষ্টার শিকার শিশুকে ডেকে নিয়ে জনসম্মুখে ঘটনার বিবরণ জানতে চান ওলামা দলে নেতা। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

বাগেরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ১৮:২৫ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ১৮:৪০

১৬ জুন সন্ধ্যা। শত শত মানুষের সামনে ৮ বছর বয়সী শিশুর কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে কীভাবে করা হয়েছে ধর্ষণ চেষ্টা। আপস-রফার চেষ্টাও করছেন বিচার করতে বসা নেতারা। উপস্থিত অনেকেই ভিডিও করছেন সে ঘটনা। গেল দুই দিন ধরে এমন ভিডিও এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। ভিডিওটি বাগেরহাটে কচুয়া উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের পদ্মনগর গ্রাম স্কুল মোড়ের।

প্রকাশ্যে ভুক্তভোগী শিশুর সাক্ষ্য নেওয়া পর অভিযুক্তের কাছেও জানতে চাওয়া হয় ঘটনা। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে তিনি স্বীকার করেন। পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চান শালিসদারের। তবে এরই মধ্যে বিচার নিয়ে বেঁধে যায় সংঘর্ষ, পণ্ড হয় সালিশ।

সামাজিকমাধ্যম ও স্থানীয়দের ফোনে ফোনে থাকা এই ভিডিও সঙ্গে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনাতেও মিলে যায় ঘটনা।

সেখানে সালিশ পরিচালনা করেন জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের ওলামা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মানফুজুর রহমান। প্রকাশে শত শত মানুষের মাঝে শিশুটির কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনাও শুনতে চান তিনি।

চকলেটের প্রলোভনে ধর্ষণচেষ্টা

শিশুটির পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত শনিবার (১৩ জুন) মাদ্রাসার টিফিন বিরতিতে পাশের একটি দোকানে খাবার কিনতে গেছিলো শিশুটি। এ সময় দোকানদার হাকিম সরদার তাকে কৌশলে চকলেট খুলে দেওয়ার কথা বলে দোকানের ভেতরে ডেকে নেয়। শিশুটি ওই দোকানীকে ‘দাদা’ সম্বোধন করতেন। সেখানে কেউ না থাকার সুযোগে হাকিম সরদার ৮ বছর বয়সী শিশুটিকে বাজে স্পর্শ করে এবং ধর্ষণের চেষ্টা করে। তবে এরই মধ্যে আরও দুই শিশু দোকানে চলে আসায় সে রক্ষা পায়। পরে বাড়িতে ফিরে শিশুটি তার মাকে সব খুলে বলে। (শিশুটি বুকে খামচির দাগ দেখায় তার মাকে)

ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা আপস-রফার চেষ্টা

শিশুটির কাছ থেকে ঘটনা শুনে তার মা তাৎক্ষণিকভাবে মাদ্রাসার বড় হুজুরকে জানায়। সন্ধ্যায় তিনি তাদের বাড়িতে আসেন এবং ঘটনা শুনে ‘কঠিন ও ন্যায্য বিচারে’র আশ্বাস দেন। স্বজন ও প্রতিবেশী মাধ্যমে খবর পান ওই এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মো. আরিফ হুসাইন। তিনি উপজেলার নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় আরও কয়েকজনকে নিয়ে সালিশের মাধ্যমে আপস-মীমাংসার চেষ্টা শুরু করে। এর জন্য অভিযুক্তের কাছ থেকে জরিমানা হিসেবে টাকা নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে ভুক্তভোগীর পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে ওই এলাকায় গেলে সেখানে হাজির হন সাবেক ইউপি সদস্য আরিফ হুসাইন। তিনি ‘বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত বলে জানান স্থানীয়রা, প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইউপি নির্বাচনের।

আজ বেলা ১১টায় ভুক্তভোগীর এক প্রতিবেশীর বাড়িতে বসে আরিফ হুসাইন বলেন, পরিবারটি যদি মামলা করে, দশ বছর ঘুরতে হবে। পরে ওই লোকের ৫ বছর জেল হলো, কিন্তু তাতে কি কোনো লাভ হবে। আরও লোকজন জানবে, মেয়েটি বড় হচ্ছে- ওর বিয়ে শাদি দিতে হবে, তাই ঝামেলা না করে এভাবে ফয়সালা করে ফেলাই ভালো। পরিবারটি আর্থিক সহযোগিতা পেলো, ভবিষ্যতেও সুবিধা অসুবিধা দেখা যাবে।

এই ঘটনায় রাজনীতি ঢুকে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি। জানতে চাইলে বলেন, এর মধ্যে শুধু শুধু আমাদের নেতা জাহিদ ভাইকে (সরদার জাহিদ) জড়ানো হচ্ছে। তিনি উপজেলা নির্বাচন করবেন, শত্রু-বিরোধী তো আছেই।

‘এখানে সব তার নিয়ন্ত্রণে’

সরদার জাহিদ কচুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি। স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন আছে আরিফ মেম্বারসহ কয়েকজনকে বিষয়টি দেখার দায়িত্ব দেন তিনি। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে আরিফ হুসাইন বলেন, ‘এখানে সব তার নিয়ন্ত্রণে। এখানে কেন কচুয়া উপজেলাতে, জাহিদ ভাই এখন উপজেলার সভাপতি না। তিনি বড় শিল্পপতি। তার সাহায্য পায়নি এমন ঘর নেই।’ তবে সালিশ বসানোয় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন তিনি।

আর টাকা নিয়ে কোনো মীমাংসার চেষ্টা করেছেন প্রশ্নে এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে যান তিনি। বলেন, আপনাদের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে এখানে পাঠাইছে যে তার (জাহিদ সরদার) বিরুদ্ধে লেখার জন্য। সাংবাদিক আমাদেরও আছে।

সালিশ দেখতে আসেন আশপাশের গ্রামের মানুষ

ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় যে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সালিশ হবে সেই খবর আগেই ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। অনেকে পুলিশকেও জানায়। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা এবং সালিশ আয়োজনের কথা আগে থেকে এবং সালিশ শুরু পর স্থানীয়রা ছাড়াও পুলিশে জানিয়েছিলেন বাগেরহাটের অন্তত ৩ জন সংবাদকর্মী। তবে অজানা কারণে পুলিশ সালিশ বন্ধের উদ্যোগ নেয়নি। এ নিয়ে তখন পুলিশের ভাষ্য ছিল, পরিবার অভিযোগ দেয়নি।

বৃহস্পতিবার চন্দ্রপাড়া, চরকাঠি, পদ্মনগর, ইজারাসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে অন্তত ১০ নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের সকলেই ঘটনা জানেন। অনেকে শালিসে উপস্থিত থাকার কথাও বলেন। তবে অজানা শঙ্কায় কিছু বলতে চাননি অধিকাংশ।

এরমধ্যে চন্দ্রপাড়া এবং চরকাঠি গ্রামের দুইজন নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, তারা মোবাইলে শুনেছে সালিশ হবে। তাই কি হয় জানতে গেছিলেন। ওই এলাকার লোক ছাড়াও আশপাশের অনেকে সেখানে গেছিল কি হয় তা দেখতে। কারণ, ধর্ষণের মত অভিযোগ তারা বিচার করছে। যা আইন আদালতে যাওয়ার কথা। শুরুতে সেখানে সবাইকে ভিডিও করতে বাঁধা দেওয়া হয়।

মেয়েটির সাক্ষী নেওয়ার পর যখন অভিযুক্ত হাকিম সরদারের সাক্ষী নেওয়া হচ্ছিল তখন তার ছেলে হাসিব সরদার বাঁধা দিতে আসেন। সালিশদারদের জেরার মুখে একপর্যায়ে হাকিম সরদার অপরাধ স্বীকার করলে তার ছেলেসহ এক গ্রুপ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। শালিস দেখতে আসা কয়েকজন তখন হাকিম সরদারকে জুতার মালা দিতে বলে। তখন তাদের লাঠি দিয়ে আঘাত করে একদল। এতে হট্টোগল বেধে যায়। পরে শালিশ শেষ না করেই চলে যান সবাই। মারামারির শেষদিকে পুলিশ এসে বাঁসি দিলে সবাই চলে যায়।

ভিডিও মুছে ফেলতে হুমকি

এদিকে সালিশ বৈঠক ও পরবর্তী সংঘর্ষের ঘটনা মুঠোফোনে ভিডিও করেন উপস্থিত অনেকে। যাদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন সেই ভিডিও। যা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ভিডিওগুলো মুছে ফেলতে চাপ ও হুমকি পাওয়ার কথা বলেছেন কয়েকজন। হুমকি পেয়েছেন এমন তিনজনের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তাদের ফোনকল ও মেসেজ পাঠিয়ে ভিডিও মুছতে বলা হয়। এরকম ৪ জনের সঙ্গে কথা হলে তারা হুমকির বিষয়টি নিশ্চিত করে মেসেঞ্জারে পাঠানো মেসেজ দেখান৷ এছাড়া সেদিনের ঘটনা জানলেও ভয়ে মুখ খুলছেন না স্থানীয়রা।

মাদ্রাসা যাওয়া বন্ধ শিশুটির, আতঙ্কে অভিভাবক

ঘটনার পর থেকে মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ রয়েছে শিশুটির। ভয় ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় কারও সঙ্গে তেমন কথাও বলছে না সে। পরিবার বলছে, তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। নানা জন নানান কথা বলছে। কি করবেন কিছু বঝতে পারছেন না।

স্বজনরা জানান, আমরা গরীব মানুষ, কি করব, কোথায় যাবো? মামলা করতে চাচ্ছি, কিন্তু কী করবো বুঝতেছি না। আরিফ মেম্বারসহ কয়েকজন ২০ হাজার টাকা নিয়ে প্রতিনিয়ত মিটিয়ে ফেলার প্রস্তাব দিচ্ছে।

শিশুটি যে মাদ্রাসায় পড়তো সেখানকার পরিচালক ইমরান হোসাইনও নিশ্চিত করছেন গত শনিবারের পর থেকে ওই ছাত্রী আর মাদরাসায় আসছেন না। সালিশ হবে এমন কিছু জানা ছিল না।

ঘটনার পর অভিযুক্ত হাকিম সরদারের দোকানটি বন্ধ থাকলেও তিনি এলাকাতেই আছেন বলে জানা গেছে। দোকান খুলে দেওয়ার জন্য তিনি সাবেক ইউপি সদস্য আরিফ হুসাইনকে বৃহস্পতিবারও অনুরোধ করেছেন। তবে চেষ্টা করেও হাকিম সরদারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সালিশকারী ওলামা দল নেতা মানফুজুর রহমানের বাড়িও পার্শবর্তী আড়িয়ামর্দন গ্রাম। মঙ্গলবার সালিশের পর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তিনি এলাকা ছেড়ে ঢাকা চলে গেছেন। আজ বিকেলে এ বিষয়ে জানতে ওলামা দল নেতা মানফুজুর রহমানে ফোন করা হলে প্রথমে তিনি রিসিভ করেন। শালিসের বিষয়ে প্রশ্ন শুনেই ‘পরে কথা বলি’ বলে ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিক বার ফোন করেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে কচুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরদার জাহিদ বলেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তার নাম ব্যবহার করে কেউ কেউ সুবিধা নেওয়া চেষ্টা করেছেন। একইসঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মব করার চেষ্টা করে এবং তাকে হেয় প্রতিপন্ন করছে বলে অভিযোগ করেন।

‘সেখানে ওই মাদরাসটি আমরা পরিচালনা করি। একটি এতিম খানা ও মসজিদও আছে। এসব করে কি সামাজিকভাবে আমরা অপরাধ করেছি। এতে নিয়ন্ত্রণে কী আছে?’

কী বলছে পুলিশ

জানতে চাইলে কচুয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হারুন অর রাশিদ বলেন, এ ঘটনায় এখনো কোনো অভিযোগ দেয়নি পরিবার। ওদেরকে তো আমরা বার বার আহ্বান করছি আসার জন্য, থানায় মামলা দেওয়া জন্য। কিন্তু আসে নাই। 

কেন আসছে না- কোনো ভয় বা শঙ্কা আছে কী এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ওদের নিজস্ব আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে মনে হয় দোটানা ভাব আছে। মামলা করবে কি করবে না। আমি তো ডেকে নিয়ে আসতে পারি না জোর করে।

সালিশ বৈঠক ঠেকানো গেলো না কেন- এমন প্রশ্নে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সালিস কোথায়? এই বিষয়টা তো আমরা জানি না।

পুলিশ গিয়ে শেষে গ্যাঞ্জাম ঠেকায়, শত শত মানুষ জড়ো হয়, সামজিকমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার কথা তুলে ধরে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘ওসি স্যার হয় তো জানে। তিনি তো আজ চলে গেছে বদলি হয়ে।’ তবে তিনি বলেন, এটা তো সালিস করার কোনো সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন

×