শিশু জায়হান হত্যা
মাকে সান্ত্বনা, শোকে দিশেহারা বাবার পাশে বসে চা খান হত্যাকারী
শিশু জায়হানের মায়ের শোকের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। আজ বৃহস্পতিবার সকালে পটিয়া পৌর সদরের ৮নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ায়। ছবি: মো. রাশেদ
আহমদ উল্লাহ, পটিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ১৮:৪২ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ১৮:৫২
দুই দিন ধরে একমাত্র সন্তানকে খুঁজে বেড়িয়েছেন বাবা-মা। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, ঝোপঝাড়, আত্মীয়স্বজনের বাসা- কোথাও বাদ যায়নি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন তাঁরা। সেই খোঁজাখুঁজির দলে ছিলেন একজন প্রতিবেশীও। সান্ত্বনা দিয়েছেন, খুঁজেছেন, উদ্বিগ্ন হওয়ার অভিনয় করেছেন। এমনকি সন্তানের শোকে দিশেহারা বাবার পাশে বসে চা পান করেছেন। কিন্তু পরিবারের কেউ জানত না, যাকে এতক্ষণ ভরসা করে পাশে পেয়েছে, সেই মানুষটিই লুকিয়ে রেখেছেন তাদের বুকের ধনের মৃত্যুর রহস্য।
চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ার পাঁচ বছরের শিশু জায়হান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বেরিয়ে আসা এসব তথ্য শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে হতবাক স্থানীয় বাসিন্দারাও।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে পটিয়া পৌর সদরের ৮নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ায় জায়হানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। জায়হানের মা জোবাইদা আকতার মুক্তা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আঁর ফোয়ারে ঘরত মারি রাহি আই, এডে আঁরার লগে দুরের। (আমার ছেলেকে ঘরে হত্যার পর খুনি এসে আমাদের সঙ্গে খোঁজ করেছে।)’
জোবাইদা আরও বলেন, ১৫ বছর ধরে সাইফুদ্দিনরা আমাদের প্রতিবেশী। তিনি কল্পনাও করেননি, প্রতিবেশীরা এমন কাজ করতে পারে। তার একটাই দাবি, ছেলে হত্যার বিচার। এসময় পুরো এলাকায় দেখা যায়, শোক আর ক্ষোভের আবহ। ছোট্ট জায়হানের বাড়িতে মানুষের ভিড়। কেউ সান্ত্বনা দিতে এসেছেন, কেউ এসেছেন পরিবারের কান্না ভাগ করে নিতে। বাড়ির সামনে রাস্তাজুড়ে বিষন্ন নীরবতা। মাঝেমধ্যে স্বজনদের আহাজারি সেই নীরবতা ভেঙে দিচ্ছে। ঘরের ভেতরে বসে থাকা মা জোবাইদা বেগম বারবার ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। তার চোখে-মুখে এখনও অবিশ্বাস যে সন্তানকে তিনি নিজের চোখের আড়াল হতে দিতেন না, সেই সন্তানকে এমন নির্মম পরিণতি বরণ করতে হবে!
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা আমাকে ছাড়া একদিনও থাকতে পারত না। ঘুমাতে গেলেও আমাকে পাশে লাগত। সেই ছেলেকে ওরা হত্যা করে দুই দিন বস্তার ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে।’
মায়ের ভাষ্য, নিখোঁজ হওয়ার পর ছেলেকে খুঁজতে গিয়ে একবার তিনি একটি শিশুর কণ্ঠে ‘ও মা’ বলে ডাক শুনেছিলেন। তখন তার বুক কেঁপে উঠেছিল। ‘আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটা কি আমার ছেলের আওয়াজ? তখন তারা বলেছিল, না এটা অন্য কারও আওয়াজ। এখন মনে হচ্ছে, আমার ছেলেটা হয়তো তখনও বাঁচার জন্য ডাকছিল, ‘বলতে বলতেই আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি’।
মঙ্গলবার জায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর চিরকুট দিয়ে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। চিরকুটের হাতের লেখার সূত্র ধরেই পুলিশ অভিযুক্তদের শনাক্ত করেছে। পুলিশের দাবি, পার্শ্ববর্তী আরেক প্রতিবেশীকে ফাঁসানোর জন্য সাইফুদ্দিন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। জায়হানের মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) কর্মকর্তা জিয়াউল হক সমকালকে বলেন, সাইফুদ্দিনের সঙ্গে তার প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাইয়ের জমিসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। এর জের ধরে জায়হানকে হত্যা করে চাচাতো ভাইয়ের ওপর দোষ চাপাতে চেয়েছিলেন সাইফুদ্দিন। এজন্য তিনি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা হচ্ছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার দিকে চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনাটির বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। তিনি বলেন, সাইফুদ্দিনের মেয়ে সাদিয়া সুলতানা নিহার হাতের লেখার সঙ্গে চিরকুটের লেখার মিল ছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। পারিবারিক জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে শিশুটিকে হত্যা করা হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা দলে দলে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পুকুরে জাল ফেলা হয়, আশপাশের ঝোপঝাড় তল্লাশি করা হয়। সেই সময় অভিযুক্ত সাইফুদ্দিনও ছিলেন খোঁজাখুঁজির সামনের সারিতে। তিনি বিভিন্ন স্থানে গিয়ে শিশুটিকে খুঁজেছেন, স্বজনদের সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং সবাইকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মফিজুর রহমান জানান, ‘তাকে দেখে কেউ সন্দেহ করার সুযোগই পায়নি। বরং তিনি এমনভাবে সবার সঙ্গে মিশে ছিলেন, যেন তিনিও শিশুটির জন্য সমান উদ্বিগ্ন।’
মামুনুর রশিদ নামের একজন প্রতিবেশী বলেন, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে খুঁজেছি। সাইফুদ্দিনও ছিল। সে যে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, এমন চিন্তা কারও মাথায় আসেনি।’
এলাকাবাসীর ভাষ্য, প্রায় ১৫ বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করছিল দুই পরিবার। সুখ-দুঃখের নানা সময়ে একে অপরের পাশে থেকেছে। সেই সম্পর্কের আড়ালেই যে এমন ভয়ংকর ট্র্যাজেডি লুকিয়ে ছিল, তা কেউ কল্পনাও করেনি।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার পর মুক্তিপণের দাবিতে একটি চিরকুট দেওয়া হয়েছিল। সেই চিরকুটের হাতের লেখাই শেষ পর্যন্ত হত্যার রহস্য উন্মোচনের পথ খুলে দেয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নুরুন্নবী নামের এক বৃদ্ধের কণ্ঠে তখনও বিস্ময়, ‘খুনি যদি অপরিচিত হতো, তাহলে হয়তো এত কষ্ট লাগত না। কিন্তু যে মানুষ দুই দিন ধরে পরিবারের সঙ্গে ছিল, সেই মানুষই এমন কাজ করেছে এটা মেনে নেওয়া কঠিন।’
দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্ব পাড়ার সরু গলিগুলোতে এখনো ভাসছে সেই প্রশ্ন- শিশুর কী অপরাধ ছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো তদন্তে মিলবে। কিন্তু ছোট্ট জায়হানের শূন্যতা, মায়ের বুকফাটা কান্না আর বিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই নির্মম বিশ্বাসঘাতকতার গল্প দীর্ঘদিন মনে রাখবে পটিয়ার মানুষ।
- বিষয় :
- চট্টগ্রাম
- শিশু হত্যা
- শিশু
