ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
ট্রাম্প ও আরাঘচির বিপরীতমুখী কূটনৈতিক পাঠ
শশী থারুর
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ২০:১০
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা চলছে, আশা করছি এই পরিস্থিতির অবসান ঘটেছে। এই অচলাবস্থা প্রায়ই বাস্তববাদী রাজনীতি, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পারমাণবিক রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়। আবার যেসব বিশ্লেষক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রযুক্তিগত কৌশল, গৌণভাবে অর্থনীতির ওপর জটিল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা বা মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতির দিকে ইঙ্গিত করেন, তারাও অবশ্যই ভুল নন। এই কাঠামোগত বিরোধগুলোই অচলাবস্থার দৃশ্যমান ভিত্তি তৈরি করেছিল। তবুও নীতি-কাগজপত্র, কূটনীতিকদের ছোটাছুটি এবং গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের আড়ালে শান্তির পথে আরও গভীর, আরও ভয়াবহ একটি বাধা লুকিয়ে আছে। আর তা হলো আলাপের গুরুত্বের পদ্ধতিগত বিরোধ। কূটনীতি এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে শুধু এই কারণে নয় যে, দুই পক্ষ শর্তাবলিতে একমত নয়, বরং আলোচনার মানে কী এবং এ বিষয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে মৌলিক মতপার্থক্য।
ইরান-মার্কিন অচলাবস্থার কেন্দ্রীয় চরিত্রদের লেখা দুটি গ্রন্থে ধারণাগত ব্যবধানটি দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘দি আর্ট অব দ্য ডিল’ (১৯৮৭) এবং আব্বাস আরাঘচির ‘দ্য পাওয়ার অব নেগোসিয়েশন’ (২০১৪)। আরাঘচি একজন পেশাদার কূটনীতিক, যিনি ঐতিহাসিক জেসিপিওএ আলোচনাকালে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমানে তিনি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো তুলে ধরেন, যা ট্রাম্পের দ্বারা জনপ্রিয় আমেরিকান জনতুষ্টিবাদী-লেনদেনমূলক মডেলের সম্পূর্ণ বিপরীত। যখন এই দুটি লেখা পাশাপাশি রাখা হয়, তখন তা কূটনৈতিক ডিএনএর এমন এক অসামঞ্জস্য স্পষ্ট করে, যা ব্যাখ্যা করে কেন বছরের পর বছর ধরে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততা প্রায়ই পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝিতে শেষ হয়েছে।
প্রথমত, প্রধান বিভেদরেখাটি ট্রাম্পের নিছক লেনদেনবাদ এবং আরাঘচির গভীরভাবে প্রোথিত প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদের মধ্যে বিদ্যমান। ‘দি আর্ট অব দ্য ডিল’ বইটিতে আলোচনাকে ব্যক্তিত্ব, প্রভাব এবং অতিরঞ্জন দ্বারা চালিত একটি শূন্য-ফলাফলের খেলা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। ট্রাম্পের কাছে আলাদাভাবে একজন আলোচক হলেন স্বতন্ত্র তারকা এবং প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো– সেগুলো সরকারি বিভাগ, বহুপক্ষীয় চুক্তি বা আন্তর্জাতিক সংস্থাই হোক না কেন– সম্পদ হিসেবে নয়, বরং একটি ‘চমৎকার চুক্তি’ বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি বিরক্তিকর বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়। লক্ষ্য হলো একটি অত্যন্ত দৃশ্যমান ও দ্ব্যর্থহীন বিজয়, যা একটি হিসাবপত্র, ছবি তোলার সুযোগ বা একটি শিরোনামে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রিধারী আরাঘচি একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। ‘দ্য পাওয়ার অব নেগোসিয়েশন’ গ্রন্থে কূটনীতিকে একটি পদ্ধতিগত, পাণ্ডিত্যপূর্ণ শাখা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যার মূলে রয়েছে তাঁর ভাষায় ‘স্মার্ট পাওয়ার’; অর্থাৎ কঠিন জাতীয় সক্ষমতা এবং কোমল কূটনৈতিক দক্ষতার সুনির্দিষ্ট সংমিশ্রণ।
আরাঘচির মতে, একক আলোচক কখনোই একাকী যোদ্ধা বা ব্যক্তিগত লাভের আশায় থাকা কোনো চুক্তিপ্রণেতা নন। তিনি হাজার হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্রের একনিষ্ঠ প্রতিনিধি। পদ্ধতিটি রাষ্ট্র পরিচালনা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কঠোর ও অপরিবর্তনীয় নীতির মধ্যে পরিচালিত হয়। যেখানে মার্কিন মডেল নমনীয়তা এবং ব্যক্তিগত প্রবৃত্তিকে গুরুত্ব দেয়, সেখানে ইরানি মডেল প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় মহৎ কৌশলের প্রতি আনুগত্য দাবি করে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজনটি বাস্তবে রূপ নেয় বাজারের যান্ত্রিকতা এবং ট্রাম্পের ‘বিগ প্লে’-এর মনস্তত্ত্বের মধ্যকার সংঘাতের মাধ্যমে। আরাঘচি স্পষ্টভাবে আলোচনার ‘বাজার-শৈলী’ বা ‘মার্কেট-শৈলী’র কথা উল্লেখ করেন– এটি একটি বহু পুরোনো পদ্ধতি, যার বৈশিষ্ট্য হলো অসীম ধৈর্য, ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা এবং ধাপে ধাপে ক্লান্তিকর দর-কষাকষি।
এই প্রেক্ষাপটে, সময় পরাজিত করার মতো কোনো শত্রু নয়, বরং অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার মতো এক শক্তিশালী মিত্র। এই বাজারি মানসিকতা সময়ক্ষেপণের ওপর নির্ভর করে এবং অনমনীয় অবস্থানকে আড়াল করতে ও প্রতিপক্ষের সংকল্প পরীক্ষা করতে ‘তারুফ’ বা আনুষ্ঠানিক সৌজন্য ও শ্রদ্ধার এক জটিল ব্যবস্থার সাংস্কৃতিক শিল্পকে ব্যবহার করে। একজন ইরানি কূটনীতিকের কাছে, যদি আপনি যথেষ্ট দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, তবে পশ্চিমা প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী তাগিদ এবং অধৈর্যই অবশেষে আপনার দর-কষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের দর্শন সম্পূর্ণরূপে গতি, বিশৃঙ্খলা এবং চূড়ান্ত মুহূর্তের উত্তেজনার ওপর নির্মিত। তাঁর কৌশল নির্ভর করে ‘চাপ প্রয়োগের’ ওপর– সর্বোচ্চ দাবি করা, সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করা, উত্তেজনা বাড়ানো এবং দ্রুত ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ একটি যুগান্তকারী সাফল্য অর্জনের জন্য সম্পূর্ণ ভাঙনের হুমকি দেওয়া। যেখানে আরাঘচি প্রতিপক্ষকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য পরিকল্পিত একটি ম্যারাথন দেখেন, সেখানে ট্রাম্প দেখেন একটি চূড়ান্ত স্বাক্ষরের দিকে দ্রুত দৌড়।
এই সংঘাত ভুল ব্যাখ্যার এক বিধ্বংসী চক্র তৈরি করে। যখন আরাঘচি এবং ইরানের কূটনৈতিক মহল তাদের চিরাচরিত চালের মতো বিলম্বের কৌশল অবলম্বন করে, ওয়াশিংটন তখন একে ‘গভীরতার’ সম্পূর্ণ অভাব বা অসততার লক্ষণ হিসেবে দেখে। যখন ট্রাম্প বা পরবর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলো ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগ করে অথবা আরও ভালো সমঝোতার দাবিতে একতরফাভাবে বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে ফেলে, তেহরান তখন এটিকে কোনো চতুর সূচনা হিসেবে দেখে না; তারা এটিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পবিত্র নিয়ম থেকে এক ‘অসভ্য’ ও আইনবহির্ভূত বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচনা করে।
শশী থারুর: ভারতের রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক; কংগ্রেসের সংসদ সদস্য; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
- আন্তর্জাতিক
