সমাজ
পরিবর্তনশীল ভাষাভুবনে ব্যক্তিত্ব যেন শুধু রোগের উপসর্গ
মু. শাখাওয়াত হুসাইন ওয়াদুদ
মু. শাখাওয়াত হুসাইন ওয়াদুদ
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
নিজেদের মানসিক অবস্থা বা অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আমরা প্রায়ই মনোবৈজ্ঞানিক পরিভাষার আশ্রয় নিই। যে শব্দগুলো আগে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল, ধীরে ধীরে এখন সেগুলো আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথনের অংশ হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ ট্রমা, টক্সিক, ডিসোসিয়েশন, ডিপ্রেশন, বাউন্ডারি, ট্রিগার– এ ধরনের শব্দ নতুন প্রজন্মের শব্দভাণ্ডারে অত্যন্ত সহজলভ্য। সামাজিক মাধ্যমের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভাষাভুবন এবং পপ সাইকোলজির প্রভাবে ক্লিনিক্যাল পরিভাষাগুলো বিশেষজ্ঞদের লেখচর্চা থেকে বেরিয়ে এসে দৈনন্দিন যোগাযোগের বহুল ব্যবহৃত শব্দে পরিণত হয়েছে। মনোবিজ্ঞানের চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরিভাষাগুলোর সম্প্রসারিত সাংস্কৃতিক এ ব্যবহারকে বলা হচ্ছে ‘থেরাপি স্পিক’। থেরাপি স্পিক আমাদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের ধরন বদলে দিচ্ছে। এ পরিবর্তন শুধু ভাষাগত নয়; বরং এটি আমাদের অনুভূতি, সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতার মানচিত্রে সংযোজন করছে নতুন সীমারেখা।
তবে সমস্যাটি হলো, যে শব্দগুলো গভীর ও জটিল মানসিক অভিজ্ঞতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, সেগুলো যখন ছোটখাটো অস্বস্তি বা সাধারণ সম্পর্কগত টানাপোড়েনের ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে, তখন তাদের প্রকৃত গুরুত্ব সীমিত হয়ে পড়ছে। উদাহরণ হিসেবে কেউ সামান্য বিরক্তি অনুভব করলেই বলছেন, ‘আমি ট্রমাটাইজড’। কিংবা সাধারণ মতবিরোধের ক্ষেত্রেও অনেকে সহজেই বলে ফেলছেন, ‘এটা গ্যাসলাইটিং’। এর ফলে একদিকে সত্যিকারের মানসিক সমস্যার গুরুত্ব হ্রাস পায়, অন্যদিকে মানুষ তার অভিজ্ঞতাকেও ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে থাকে। দৈনন্দিন পরিসরে এ ধরনের শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে সাধারণীকরণ করে তোলে। ফলে শব্দগুলো ধীরে ধীরে দোষারোপের শর্টকাটে পরিণত হয়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পারস্পরিক সম্পর্কে।
থেরাপি স্পিক আমাদের, বিশেষত নতুন প্রজন্মের দৈনন্দিন শব্দভাণ্ডারকে প্রায় আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এটি এখন প্রেম, সম্পর্ক, আঘাত ও যন্ত্রণার অভিব্যক্তিকে একটি বিশেষ কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে, যেখানে ব্যক্তিত্বের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডায়াগনস্টিক লেবেল দেওয়া হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্ববিষয়ক লেখক ফ্রেয়া ইন্ডিয়ার ভাষায়, ‘ধীরে ধীরে আমরা স্বাতন্ত্র্য ভুলে যাচ্ছি। এখন আর আমাদের নিজস্ব কোনো ব্যক্তিত্ব নেই। আমাদের ব্যক্তিত্ব এখন হয়ে গেছে মানসিক রোগের উপসর্গ।’
ব্যক্তিগত উদাহরণ দিই। একবার পরীক্ষার দিন হঠাৎ টের পেলাম, আমাদের একজন বন্ধু অনুপস্থিত। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাঁকে অনুপস্থিত দেখে সবাই বেশ উদ্বিগ্ন। পরে জানা গেল, সে পরীক্ষার কথা ভুলে গেছে। এ ধরনের ঘটনা তার ক্ষেত্রে নতুন ছিল না; ক্লাস মিস, বাস মিস কিংবা গুরুত্বপূর্ণ শিডিউল ভুলে যাওয়া তার সঙ্গে প্রায়ই হতো। আমরা তার এই প্রবণতা নিয়ে হাসাহাসি করতাম ঠিকই, তবে তার প্রতি এক ধরনের স্নেহ ও সহানুভূতিও কাজ করত। আমরা তাকে বলতাম ‘ভুলোমনা’। কিন্তু আজকের দিনে কেউ সহজেই বলে বসতে পারেন– ‘তার এডিএইচডি (অ্যাটেনশন-ডেফিসিট/ হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার; এতে আক্রান্ত ব্যক্তির মনোযোগ, আবেগ ও অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়) ছিল।’ অর্থাৎ যেটিকে একসময় ব্যক্তিত্বের সাধারণ বৈশিষ্ট্য মনে করা হতো, তাকে এখন মানসিক রোগের সম্ভাব্য উপসর্গ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
কয়েক দশক আগেও আমরা অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষদের বলতাম লাজুক। কিন্তু এখনকার প্রজন্ম খুব সহজেই একে অটিজমের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখতে পারে। এখন আর লাজুকতা বা কোমলতা কারও ব্যক্তিত্ব নয়, বরং একটি নিউরোলজিক্যাল শ্রেণির বৈশিষ্ট্য। আগে বলা হতো, ছেলেটি তার মায়ের মতো হয়েছে। তবে এখন আর আমরা বাবা-মায়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণে গঠিত মানুষ নেই। যুগের পরিভাষায় আমরা হয়ে গেছি ‘শৈশবের আঘাত ও মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট চরিত্র মাত্র।’
আমাদের চরিত্রের প্রতিটি সুন্দর, বিরক্তিকর বা আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যকে এখন একটি ডায়াগনস্টিক নাম দিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। পরিবার কখনও কখনও আমাদের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য দিয়ে শনাক্ত বা সম্বোধন করে। কিন্তু পপ মনোবিজ্ঞানের পরিভাষা দিয়ে প্রভাবিত ভাষাকাঠামো সেই সম্বোধনকে মেডিকেল টার্মে রূপান্তর করে দেয়। ফলে চরিত্র বৈশিষ্ট্য এখন আর আমাদের ব্যক্তিত্ব নয়; হয়ে গেছে প্রেসক্রিপশনের লেবেল। এই চিকিৎসাকেন্দ্রিক ভাষা সংস্কৃতিতে মনে করা হয়, মানুষের চরিত্রের এসব বৈশিষ্ট্য কোনো না কোনো ‘সমস্যা’ এবং এগুলোর ‘চিকিৎসা’ আছে। যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে একসময় সাধারণ মানবিক আচরণ হিসেবে দেখা হতো, যেমন অভ্যাস বা বদঅভ্যাস, খামখেয়ালি, অতিরিক্ত আবেগ; আজকাল এগুলোকে মানসিক সমস্যা বা কোনো ডিজঅর্ডারের লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। লেবেলের এই তালিকা ক্রমে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে মনে হয় কেউই আর স্বাভাবিক নেই।
অনেক গবেষক বলছেন, তরুণরা তাদের মানসিক সমস্যাকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের শেখানো হচ্ছে যে স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বই একটি সমস্যা।
২০২৪ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জেনজির ৭২ শতাংশ তরুণ মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা তাদের পরিচয়ের অংশ। যেখানে তাদের আগের প্রজন্ম, অর্থাৎ বুমারের মধ্যে এ সংখ্যা ২৭ শতাংশ। এ পরিস্থিতি আধুনিক জীবনের দার্শনিক বিবর্তনেরই লক্ষণ।

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সবকিছুর ব্যাখ্যা চাই; হোক সেটা মনস্তাত্ত্বিক, বৈজ্ঞানিক বা বিবর্তনমূলক যুক্তিতে। আমরা ভাবি, সব অভিজ্ঞতাকেই শ্রেণিবদ্ধ করা সম্ভব এবং সব ‘সমস্যা’ সংশোধনযোগ্য।
এখন আর উদার বলতে কেউ নেই। তারা হয়ে গেছে ‘পিপল প্লিজার’। সহজভাবে অনুভূতি প্রকাশ করা মানুষ নেই; আসলে তারা ‘অ্যাংজাইটি অ্যাটাচড’ অথবা কো-ডিপেন্ডেন্ট। প্রজন্মের পরিভাষায় পরিশ্রমী মানুষ আসলে ‘ট্রমাটাইজড, ইনসিকিউর ওভার অ্যাচিভার’। আমাদের আনাড়ি মায়েদের আসলে ‘আনডায়াগনজড এডিএইচডি’ আছে। আমাদের শান্ত সরল বাবারা জানেনই না, তারা আসলে অটিজমে আক্রান্ত, কিন্তু আমরা জানি। মানুষের ব্যক্তিত্বের সাধারণ বৈশিষ্ট্যকে স্বীকার না করে তাদের আমরা ক্রমাগত ‘জাজ’ করতে থাকি। এতে আমরা হারিয়ে ফেলছি জীবনের স্বাভাবিক বিস্ময় এবং অনুভূতির সারল্য।
কেউ কাউকে ভালোবাসলে মনে করা হয়, তার এই নির্ভরতার কারণ আসলে নিরাপত্তাহীনতা, ভয়, অতীতের ক্ষত কিংবা অসম্পূর্ণ চাহিদা পূরণের অবচেতন প্রচেষ্টা। প্রেমকেও আমরা আর নিরঙ্কুশ বিস্ময় হিসেবে দেখতে পারি না। ইদানীং এটিকে ডায়াগনজ করা হচ্ছে ‘ট্রমা রেসপন্স’ হিসেবে। আমাদের সুতো ছেঁড়া অনুভূতি এখন হয়ে গেছে ‘ডিজরেগুলেটেড নার্ভাস সিস্টেম’-এর বহিঃপ্রকাশ। আগের প্রজন্ম যেমন অনুভূতি ও সাধারণ সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করতে পারত, আমরা এখন আর তা পারি না। চারপাশে হাজারো মানুষের ভিড়ে যার যার ‘রিজেকশন সেন্সিটিভ ডিস্ফোরিয়া’ নিয়ে আমরা সবাই এখন একা। পপ সাইকোলজির ল্যাবরেটরিতে আমরা এখন একেকটি কেস স্টাডি। আমরা এখন অ্যাটাচমেন্ট ডিজঅর্ডারের পরিসংখ্যান মাত্র।
স্বীকার করি, মানুষের দৈনন্দিন শব্দভাণ্ডারে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষা সহজলভ্য হওয়ার কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। থেরাপি স্পিক মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা ও আলোচনাকে আগের চেয়ে দৃশ্যমান করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, কোনো বিশেষায়িত টার্ম সঠিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহার না করা হলে তা সহজেই বিভ্রান্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে থেরাপি স্পিকের ধারণাটি রেজিস্টার শিফটিংয়ের উদাহরণ। রেজিস্টার শিফটিং হলো প্রসঙ্গ অনুযায়ী ভাষার রূপান্তর, যেখানে একই শব্দ বা বাক্য পরিস্থিতি সাপেক্ষে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। এখানে মনোবিজ্ঞান ও ক্লিনিক্যাল থেরাপির বিশেষায়িত ভাষা সাধারণ কথ্যভাষায় ঢুকে ধীরে ধীরে পপ সাইকোলজির বহুল ব্যবহৃত শব্দভাণ্ডার হয়ে উঠছে।
‘ট্রমা’, ‘ডিপ্রেশন’, ‘অ্যাংজাইটি’ ইত্যাদি শব্দ মূলত ক্লিনিক্যাল টার্ম হিসেবে ব্যবহৃত হলেও দৈনন্দিন পরিমণ্ডলে এগুলো আরও সাধারণ পরিস্থিতি বর্ণনায় ব্যবহার করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখানে অর্থের প্রসারণ (সেমান্টিক ব্রডেনিং) ঘটছে। আগে যে শব্দটি সীমিত বা নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হতো, এখন তা আরও বিস্তৃত বা বহুমাত্রিক অর্থ বহন করে। যেমন ক্লিনিক্যাল অর্থে ‘ট্রমা’ এমন একটি মানসিক অভিজ্ঞতা, যা ব্যক্তির স্নায়ুতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। কিন্তু আজকাল অনেক সাধারণ অসুবিধাজনক ঘটনাকেই ‘ট্রমা’ বলা হচ্ছে। এই প্রবণতা কখনও কখনও বা অর্থের সংকোচন (সেমান্টিক ব্লিচিং) ঘটায়। ফলে অর্থের পরিসীমা ছোট হয়ে যায়।
মানসিক স্বাস্থ্যকে দৈনন্দিন আলোচনায় সহজলভ্য করে তোলার পেছনে থেরাপি স্পিকের ভূমিকা রয়েছে, সত্যি। এতে আমরা আবেগ নিয়ে কথা বলার জন্য নতুন শব্দভাণ্ডার পেয়েছি এবং সম্পর্কের সীমারেখা নির্ধারণেও সচেতন। থেরাপি স্পিকের মাধ্যমে মনোবিজ্ঞানের অন্তর্দৃষ্টি সরলীকৃত হয়ে জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। টেকনিক্যাল শব্দগুলো এখানে সাধারণ কথ্যভাষার সঙ্গে মিশে নতুন এক ডিসকোর্স গড়ে তোলে, যা একদিকে সহায়ক, একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকরও। কারণ টার্মগুলোর সাধারণীকৃত ব্যবহার প্রায়ই ভুল ডায়াগনসিসের জন্ম দেয়। অনেক সময় সম্পর্কের স্বাভাবিক জটিলতাকেও ক্লিনিক্যাল টার্ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয় এবং মনোবৈজ্ঞানিক পরিভাষার আড়ালে ঢাকা পড়ে সাধারণ ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব। কেননা, শব্দ যত শক্তিশালী, তার ভুল ব্যবহার তত বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
যখন আমাদের আগের প্রজন্মের কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়, তারা কেন একে অপরকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন; তারা অগোছালো উত্তর দেন। কেননা, তারা কখনও সম্পর্কের যৌক্তিকতা নিয়ে চিন্তা করেননি, বরং সম্পর্ককে শুধু উপভোগ করেছেন। তাদের সেই অগোছালো উত্তরের মধ্যেই ছিল মানবিকতার সৌন্দর্য এবং এই বিশ্লেষণ না করার প্রবণতাই তাদের সম্পর্কের শক্তি। বর্তমান প্রজন্ম সম্পর্কের সূক্ষ্মতা ব্যাখ্যা করতে পারে ঠিকই, কিন্তু তারা সেই সম্পর্ককে উপভোগ করতে ব্যর্থ হয়। কেননা, যুক্তির সীমার মধ্যে মানবমনের অনিয়ন্ত্রিত ও গভীর মানবিক অনুভূতিকে ব্যাখ্যা এবং একই সঙ্গে উপভোগ করা সত্যিই কঠিন।
এই প্রবণতার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিলিয়ন ডলারের শিল্প, যেখানে বিশ্লেষণই পণ্য। থেরাপি, সেলফ-হেল্প, ওয়েলনেস, মাইন্ডফুলনেস, ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ, অনলাইন থেরাপি অ্যাপ– সবকিছু মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল এক বাজার। এখানে বিশ্লেষণ আর নিছক পরামর্শ বা কথোপকথন নয়। এটি এখন বেচাকেনার মতোই একটি কমোডিটি। সাবস্ক্রিপশন, শেয়ার, লাইক– সবই এই বাণিজ্যের অংশ। সামাজিক মাধ্যমে এর চেহারা আরও স্পষ্ট। থেরাপি স্পিককেন্দ্রিক সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট এই পুরো প্রক্রিয়াকে আরও বেশি লাভজনক পণ্যে রূপান্তর করেছে। ফলে সম্পর্ক, আচরণ বা অনুভূতির ব্যাখ্যা আর স্বতঃস্ফূর্ত বোঝাপড়ার প্রক্রিয়া নয়। এটি এখন আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি ট্রেন্ডি পরিষেবা; একটি পণ্য।
তবুও আমরা অনেকে বিশ্বাস করি, জীবনকে ‘ক্র্যাক’ করার মূল ‘হ্যাক’ হলো সবকিছু শ্রেণিবদ্ধ ও ব্যাখ্যা করা। আমাদের জীবনে স্মৃতির জায়গা দখল করে নিয়েছে প্রমাণ; অনুভূতির জায়গায় এসেছে ব্যাখ্যা, আর সম্পর্কের জায়গায় এসেছে অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল। আমাদের শেখানো হয়েছে–
জীবনের অর্থ পুরোটাই মাথার ভেতরে লুকিয়ে আছে; বাইরে নয়। আর এই নিরন্তর ব্যাখ্যার তৃষ্ণা ‘রক্তের ভেতর থেকে’ আমাদের ক্লান্ত করে দিচ্ছে। নিজেদের ক্লিনিক্যাল টার্মে শ্রেণিবদ্ধ করতে আমরা
ব্যয় করছি সাধের তারুণ্য। আমাদের এই প্রবণতার ‘পণ্য’ ঘরে তুলছে অন্য কেউ।
তবে সবকিছু আসলেই ব্যাখ্যার বিষয় নয়। মানবিক অনুভূতিকে সবসময় শুধু হরমোন নিঃসরণের মাত্রা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আমাদের দর্শন, ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অনুভূতি সবসময় ব্যাখ্যা ও যুক্তির ধার ধারে না। কখনও কখনও নিজেদের সব অনুভূতিকে ক্লিনিক্যাল ব্যাখ্যার কাছে সমর্পণ না করাটাও প্রজ্ঞা। কেননা, একদিন হয়তো আমরা বুঝতে পারব, যদি সত্যি সমস্যা কিছু থাকে, তবে সেটা আমাদের অনুভূতি; আমাদের মনুষ্য-বৈশিষ্ট্য। আর ‘মানুষ হওয়া থেকে’ সুস্থ হওয়া যায় না।
মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন ওয়াদুদ: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সমাজ
