বাজার
পাঙাশ কীভাবে ডোরি মাছ হলো
মো. শরীফুল ইসলাম
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের সুপারশপ, রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুড চেইন ও অনলাইন খাদ্যবাজারে গত এক দশকে একটি নাম দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে– ‘ডোরি ফিশ ফিলে’। ফিশ অ্যান্ড চিপস, ফিশ ফিঙ্গার, বার্গার, স্যান্ডউইচ কিংবা শিশুদের বিভিন্ন খাবারে এখন ‘ডোরি ফিশ’ একটি পরিচিত উপাদান। অনেক ভোক্তা মনে করেন, এটি ইউরোপ বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কোনো উন্নতমানের সামুদ্রিক মাছ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বাজারে ‘ডোরি ফিশ’ নামে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ ফিলে আসলে পাঙাশ মাছের।
ডোরি নামের পেছনের গল্প
বিশ্বে প্রকৃতপক্ষে ‘ডোরি’ নামে কয়েকটি সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। যেমন জন ডোরি, সিলভার ডোরি ও মিরর ডোরি। এসব মাছ মূলত ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সামুদ্রিক অঞ্চলে পাওয়া যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক উচ্চমূল্যের মাছ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু নব্বই দশকের শেষভাগে ভিয়েতনামে পাঙাশের শিল্পভিত্তিক চাষ ও রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এর ফিলে বিভিন্ন নামে বিক্রি হতে শুরু করে– পাঙাশিয়াস ফিলে, বাসা ফিলে, ক্রিম ডোরি এবং ডোরি ফিলে। ধীরে ধীরে ‘ডোরি’ নামটি একটি বিপণন ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। বর্তমানে বিশ্ববাজারে ‘ক্রিম ডোরি’ বা ‘ডোরি ফিলে’ নামে যেসব পণ্য বিক্রি হয়, তার বড় অংশই ভিয়েতনামে উৎপাদিত পাঙাশের ফিলে।
পাঙাশ: বাংলাদেশের নীরব বিপ্লব
দেশের অন্যতম একক চাষযোগ্য মাছ এখন পাঙাশ। বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী দেশে বার্ষিক মাছ উৎপাদন ৫০ লাখ টনেরও বেশি, যেখানে পাঙাশের উৎপাদন কয়েক লাখ টন। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে এই শিল্পের ওপর। বাংলাদেশে পাঙাশ চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্বের কয়েকটি দিক হলো– কম সময়ে বাজারজাত করা যায়; খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা (এফসিআর) তুলনামূলক ভালো; উৎপাদন খরচ কম; সারাবছর উৎপাদন সম্ভব।
পুষ্টিগুণে পাঙাশ কতটা সমৃদ্ধ?
পাঙাশ ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালেও বৈজ্ঞানিক গবেষণা ভিন্ন কথা বলে। পাঙাশ উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস, যাতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অ্যামিনো এসিড, ফসফরাস, সেলেনিয়াম, ভিটামিন বি-১২, নিয়াসিনসহ কয়েক ধরনের বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন বিদ্যমান। একই সঙ্গে এতে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলক কম। যদিও সালমন, টুনা বা ম্যাকারেলের মতো সামুদ্রিক তৈলাক্ত মাছের তুলনায় পাঙাশে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ কম, তবুও এটি নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত খাদ্য।
‘পাঙাশ’কে ‘ডোরি’ বানানোর প্রয়োজন কেন?
‘পাঙাশ’ নামটি অনেক ভোক্তার কাছে একটি সাধারণ ও কম দামি মাছের ধারণা তৈরি করলেও ‘ডোরি’ নামটি তুলনামূলক আধুনিক, বিদেশি এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের ভাবমূর্তি সৃষ্টি করে। ফলে একই মাছের ফিলে ‘ডোরি ফিশ’ নামে উপস্থাপন করলে ভোক্তার আগ্রহ বাড়ে, রেস্টুরেন্টের মেন্যু আরও আকর্ষণীয় মনে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বেশি মূল্য আদায় করা সম্ভব হয়। তবে সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন ভোক্তাকে জানানো হয় না, তথাকথিত ‘ডোরি’ আসলে পাঙাশ মাছেরই ফিলে।
বৈশ্বিক সমস্যা: বিভ্রান্তিকর লেবেলিং
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী বিক্রি হওয়া মাছের উল্লেখযোগ্য অংশ ভুল নামে বাজারজাত হয়। কখনও কম দামি মাছকে দামি মাছ হিসেবে বিক্রি করা হয়, কখনও বিপন্ন প্রজাতির মাছকে অন্য নামে বিক্রি করা হয়। এই সমস্যাকে বলা হয় সিফুড মিসলেবেলিং বা বিভ্রান্তিকর লেবেলিং। এর ফলে ভোক্তা প্রতারিত হন; বাজারে অসৎ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়; খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে; ট্রেসেবিলিটি বা উৎস শনাক্তকরণ কঠিন হয়। বিশ্বের অনেক দেশে এখন ডিএনএ বারকোডিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছের প্রকৃত প্রজাতি শনাক্ত করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইনে কী আছে?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো দেশে মাছ ও মাছজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তাকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। সাধারণত পণ্যের বাণিজ্যিক নামের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক নাম, মাছটি চাষকৃত নাকি প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে আহরিত, এর উৎপত্তিস্থল এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সংক্রান্ত তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশের আইন কী বলে?
বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন- ২০০৯ অনুযায়ী পণ্যের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান আইনত প্রশ্নবিদ্ধ। যদি উপস্থাপিত পরিচয় থেকে কোনো খাদ্যপণ্য সম্পর্কে ভোক্তা ভুল ধারণা পোষণ করেন, তাহলে তা ভোক্তার তথ্য জানার অধিকারের পরিপন্থি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এর বাস্তবায়ন তেমন দেখা যায় না।
ভোক্তার জানার অধিকার
জাতিসংঘ স্বীকৃত ভোক্তা অধিকারের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো– একজন ভোক্তার জানার অধিকার রয়েছে, তিনি আসলে কোন প্রজাতির মাছ কিনছেন; মাছটি দেশীয়ভাবে উৎপাদিত নাকি আমদানি করা; এর বৈজ্ঞানিক পরিচয় কী; এটি চাষকৃত নাকি প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত এবং কোন দেশ বা অঞ্চল থেকে এসেছে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে আধুনিক নানা ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্যপণ্যের উৎস ও পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের খাদ্য খাতেও এ ধরনের উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
পাঙাশ নিয়ে লুকোচুরির বদলে গর্ব করুন।
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম বড় মৎস্য উৎপাদনকারী দেশ। স্বাদ, পুষ্টি ও প্রাপ্যতার কারণে পাঙাশ আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই পাঙাশকে ‘ডোরি’ নামের আড়ালে লুকিয়ে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। একটি মাছের নাম পরিবর্তন করে সাময়িকভাবে বাজারমূল্য বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে বাজার টিকে থাকে ভোক্তার আস্থা, সঠিক তথ্য এবং স্বচ্ছতার ওপর।
পাঙাশ কোনো নিম্নমানের মাছ নয়; বরং এটি দেশের অন্যতম সফল অ্যাকুয়াকালচার প্রজাতি, যা লাখো মানুষের পুষ্টি ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত। ভোক্তাকে বিভ্রান্ত না করে যদি পণ্যের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরা যায়, তাহলে লাভবান হবে উৎপাদক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা– সকলেই। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সহজ সত্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ– ‘মাছের নাম বদলানো যায়, কিন্তু মাছের পরিচয় বদলানো যায় না।’
ড. মো. শরীফুল ইসলাম: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিষ্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষিকেন্দ্র, ঢাকা
[email protected]
- বিষয় :
- বাজার
