ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

বিশ্ব শরণার্থী দিবস

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক দায়

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক দায়
×

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর ২০ জুন বিশ্বজুড়ে ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবস’ পালিত হয়। এ বছর এর বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ‘শরণার্থীদের সঙ্গে সংহতি’। মূল বার্তা হলো, শরণার্থীদের শুধু কথায় সম্মান জানানো নয়, বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে পাশে দাঁড়ানো; তাদের নিরাপত্তার অধিকার রক্ষা করা; সংঘাত ও নির্যাতনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের পাশে থাকা। অন্যদিকে এ বছর যখন আমরা বিশ্ব শরণার্থী দিবসের স্লোগান শুনছি, তখন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর দীর্ঘশ্বাস আরও দীর্ঘতর হচ্ছে। কিন্তু দিবসটি কতটা তাৎপর্য ধারণ করে এসব বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য?

মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গারা বহু দশক ধরে নাগরিকত্বের বঞ্চনা, বৈষম্য এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত নিপীড়নের শিকার। বিশেষত ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন তাদের রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত করে। এরপর বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তবে ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর মুখে জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢল নেমেছিল লাখ লাখ রোহিঙ্গার। এই সংকট এখন কেবল মানবিক স্তরে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় টাইম-বম্ব বা উগ্রবাদের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

এদিকে মিয়ানমারের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার এবং রাখাইন রাজ্যের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো মিয়ানমারের জান্তার সঙ্গে পর্দার আড়ালে ও প্রকাশ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। পশ্চিমা বিশ্ব মুখে মানবাধিকারের কথা বললেও বাস্তবমুখী কোনো রোডম্যাপ তৈরি করতে পারেনি। উপরন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা এবং নতুন নতুন বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুটি প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্ব শরণার্থী দিবসের মূল দর্শনই হলো– এক সংকটের কারণে অন্য সংকটকে আড়াল করা যাবে না।

অবশ্য রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার এবং জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াগুলো চলমান। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) রোম সনদের আলোকে চলমান তদন্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার পাওয়ার আশাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যদিও এই আইনি প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত ধীরগতির, যা অপরাধী পক্ষকে আরও বেশি সময় দিচ্ছে। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন এই আইনি লড়াইয়ে আর্থিক, রাজনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধি করে। 
আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশন (১৯৫১) এবং গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অন রিফিউজিসের (জিসিআর) মূল কথাই হলো ‘দায়িত্বের অংশীদারিত্ব’ (বার্ডেন শেয়ারিং)। বাংলাদেশ এই কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও সর্বোচ্চ মানবিকতা প্রদর্শন করেছে, যা বৈশ্বিক স্তরে প্রশংসিত। কিন্তু বিশ্ব সম্প্রদায় তাদের দায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিস্পৃহ থাকতে পারে না। এই সংকট থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক দায়বদ্ধতাকে তিনটি স্তরে ভাগ করে কার্যকর করতে হবে: ১. তহবিল সংকট দূরীকরণ: আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোকে রোহিঙ্গা রেসপন্স প্ল্যানে (জেআরপি) অর্থায়ন বাড়াতে হবে। শুধু রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার রসদ নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতিপূরণের জন্যও বৈশ্বিক সহায়তা প্রয়োজন। ২. তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত দেশগুলোকে থার্ড-কান্ট্রি রিসেটেলমেন্ট বা তৃতীয় কোনো দেশে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া আরও জোরদার ও গতিশীল করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কিছুটা হলেও হ্রাস পায়। ৩. আসিয়ান ও আঞ্চলিক চাপ: মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য। তাই মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো আঞ্চলিক দেশগুলোকে মিয়ানমারের ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা ওল্টানো বা দুঃখ প্রকাশের দিন নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ব্যর্থতার খতিয়ান খতিয়ে দেখার দিন। রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘসূত্রতা আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বিশ্ববিবেক এবং বৈশ্বিক মানবাধিকার ব্যবস্থার এক বিরাট দেউলিয়াত্বকে নির্দেশ করে। মিয়ানমারে শান্তি ফিরিয়ে আনা, রাখাইনে স্থিতিশীলতা তৈরি করা এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার জন্য জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি বিশেষ বৈশ্বিক রোডম্যাপ প্রয়োজন। যতদিন বিশ্বনেতারা তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই সংকটের সমাধানে ঐক্যবদ্ধ ও কঠোর  না হচ্ছেন ততদিন বিশ্ব শরণার্থী দিবসের স্লোগান অর্থহীন ও প্রহসনমূলক রয়ে যাবে। রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই ও স্থায়ী সমাধানই হোক এই বছরের বিশ্ব শরণার্থী দিবসে বিশ্ববাসীর প্রধান অঙ্গীকার।

ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: শিক্ষক ও চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, 
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
 

আরও পড়ুন

×