ভরা মৌসুমে চড়া বাজার
চাউলের মূল্য কমাইতেই হইবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভরা মৌসুমে যখন চাউলের মূল্য হ্রাস পাইবার কথা তখনই তাহার বর্ধিত মূল্য উদ্বেগজনক। শুক্রবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারে বিভিন্ন জাতের চাউলের মূল্য হঠাৎ প্রতি কেজিতে পাঁচ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাইয়াছে। সংগত কারণেই ইহাতে ভোক্তা যদ্রূপ চাপের মুখে পড়িয়াছেন, তদ্রূপ হতাশ সাধারণ কৃষক। দেশে যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলিতেছে তখন প্রধান খাদ্যপণ্যের মূল্য আরেক দফা বৃদ্ধির অর্থ হইল জীবনযাত্রার ব্যয়ে আবার উল্লম্ফন। আর ইহা এমন সময়ে ঘটিতেছে যখন সিংহভাগ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পাইয়াছে। অনেকে চাকরিচ্যুতি ও বেতন হ্রাসের শিকারও হইয়াছেন। অন্যদিকে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আর্থিক সক্ষমতার অভাবে অধিকাংশ কৃষক মৌসুমের শুরুতে ধান বিক্রয় করিয়া দিয়াছেন, যখন ধানের মূল্য তুলনামূলক অনেক কম ছিল। একই পরিবারগুলিকে এখন জীবন ধারণের জন্য চাউল ক্রয় করিতে হইতেছে। অর্থাৎ এই সকল কৃষক ধান বিক্রয় করিতে গিয়া একবার লোকসান গুনিয়াছেন, এখন তাহাদের অধিক মূল্যে সেই ধান ক্রয় করিতে হইতেছে। অর্থাৎ লোকসানের উপর লোকসান।
এই সময়ে চাউলের মূল্যবৃদ্ধির পশ্চাতে সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপ সংগত কারণেই সম্মুখে আসিয়াছে। কারণ ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ করিয়া মধ্যস্বত্বভোগী, মিলার ও বড় ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ ধান সংগ্রহ করিয়াছেন। বর্তমানে চাউলের বাজারে উহাদেরই কর্তৃত্ব চলিতেছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক সমকালকে বলিয়াছেন, তাহাদের পক্ষ হইতে নিয়মিত বাজার তদারকি চলমান; বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও মনিটরিং করিতেছে। কিন্তু এই সংকট কেবল বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সমাধান হইবে না। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি এমন দাঁড়াইয়াছে, মধ্যস্বত্বভোগী, মিলার ও বড় ব্যবসায়ীদের নিকট সকলেই অসহায়। যদি সরকার ভরা মৌসুমে খোদ কৃষকের নিকট হইতে ধান ক্রয় করিয়া রাখিত, তাহা হইলে বাজারে উক্ত গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য কিছুটা হইলেও হ্রাস পাইত। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমে বিগত সময়ে এই বিষয়ে বারংবার সতর্ক করা হইলেও সরকারের চৈতন্যোদয় হয় নাই। তাহারা বরং ধান ক্রয়ে অতীতের ন্যায় মিলারদের উপর আস্থা স্থাপন করিয়া শেষোক্তদেরই হস্তকে শক্ত-পোক্ত করিয়াছে।
একজন কৃষক সমকালের নিকট অভিযোগ করিয়াছেন, ধান মজুত রাখিতে গিয়া তাহার ১৫ শতাংশ হারে ব্যাংক সুদ দিতে হইতেছে। যেই কারণে প্রতি মাসে ধানের পশ্চাতে খরচ কেজিতে প্রায় দেড় টাকা বৃদ্ধি পায়। সরকার এই সমস্যাটিরও সমাধান করিতে পারিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেইদিকে তাহার দৃষ্টিপাতের সময় কোথায়! সরকারি পর্যায়ে চাউলের মজুত যথেষ্ট থাকিলে এই সময়ে সরকার বাজারে হস্তক্ষেপ করিতে পারিত। যাহা অধিকতর দুর্ভাগ্যজনক, বহু দশক যাবৎ বিষয়টি আলোচিত হইলেও মজুত ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টা কোনো সরকারই আমলে লয় নাই। বর্তমান সরকার এই সীমাবদ্ধতা কাটাইতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে, তাহা কেহ জানে না।
কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য এবং ভোক্তার জন্য স্থিতিশীল বাজার, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের দায়িত্ব। এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক নীতি, শক্তিশালী বাজার তদারকি এবং কৃষকবান্ধব সংগ্রহ ব্যবস্থা। অন্যথায় কৃষক উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হইবেন; ভোক্তা মূল্যস্ফীতির চাপে পড়িবেন এবং খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তিও দুর্বল হইবে। বিষয়টি যদ্রূপ সরকারকে বিবেচনা করিতে হইবে তদ্রূপ ধান সংরক্ষণে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে হইবে, যাহাতে কৃষক সহজেই উহার সুফল পান। ইহাতে কৃষক মৌসুমের শুরুতেই স্বল্প মূল্যে ধান বিক্রয় করিতে বাধ্য হইবেন না। ইহার সহিত কৃষিপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্বচ্ছতা ও অযৌক্তিক মুনাফা রোধেও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করিতে হইবে।
কেহ চাউল অবৈধভাবে মজুত করিলে তাঁহার বিরুদ্ধে অভিযান চালাইয়া আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা লইতে হইবে। চাউলের মূল্যবৃদ্ধির সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় লইয়া ইহার মূল্য স্থিতিশীল রাখিতেই হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
