জন্মদিন
মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা
সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯)
তানিয়া খাতুন
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
আফ্রো-এশীয় শান্তি পরিষদের অন্যতম পুরোধা আলী আকসাদ এসে যখন সুফিয়া কামালকে বলেন, ‘খালাম্মা, লুমুম্বাকে তো ওরা মেরে ফেলল!’ খবরটা শুনে তিনি থেমে গেলেন। কাজে নেমে পড়লেন লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি তৈরি করতে। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে হাজার মাইল দূরের আফ্রিকার দেশ কঙ্গোর প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বার নির্মম হত্যার সংবাদ তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত ও স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মুহূর্তের জন্য তিনি যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। একজন অচেনা অজানা মানুষ; জাতি-ধর্ম-বর্ণ কিছুর মিল নেই, তবুও তেমন এক মানুষের অন্যায় হত্যাকাণ্ডে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হওয়া– মানবাধিকারের এই বোধটুকুই সুফিয়া কামালকে তাড়িত করেছে সারাজীবন।
মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও মুক্তির প্রশ্নে আজীবন সোচ্চার ছিলেন সুফিয়া কামাল। তিনি মানবাধিকারের কথা বলেছেন কেবল নীতিগত অবস্থান থেকে নয়; গভীর মানবপ্রেম ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মানুষের প্রতি আন্তরিক মমত্ববোধ ছাড়া মানবাধিকারের প্রকৃত চর্চা সম্ভব নয়। মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে না পারলে একজন প্রকৃত মানবাধিকারকর্মী হয়ে ওঠা যায় না। তিনি তাঁর সমগ্র জীবন ও কর্মের মাধ্যমে এই সত্যেরই প্রমাণ রেখে গেছেন।
তাঁর দীর্ঘ কর্মমুখর জীবনে নারীমুক্তির আন্দোলন ছিল অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। তাঁর কাছে নারীমুক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন নারী ইস্যু ছিল না; বরং ছিল সামগ্রিক মানবমুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বলেছিলেন, ‘মেয়েদের স্বাধীনতা কেউ দিয়ে দেবে না, আদায় করে নিতে হবে। পুরুষশাসিত সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মেয়েদের পায়ে যে বেড়ি পরিয়ে রেখেছে, তা ভাঙতে গেলে সচেতন সংগ্রাম দরকার। স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচার নয়; নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, নিজেকে মানবিক মর্যাদায় অভিষিক্ত করা।’
সুফিয়া কামালের ওপর বেগম রোকেয়ার প্রভাব ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী। সময়ের ব্যবধান থাকলেও তাদের চিন্তা, আদর্শ ও সংগ্রামের মধ্যে রয়েছে গভীর ঐক্যসূত্র। বাল্যকালে বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে পড়ার সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপ তিনি সারাজীবন বহন করেছেন। তবে তাঁর কর্মজীবন ছিল সেই আদর্শেরই বাস্তব রূপ।
দেশভাগের পর ঢাকায় এসে কবি সুফিয়া কামালের আলাপ হয় প্রখ্যাত নারী নেত্রী লীলা নাগ, যুঁইফুল রায়, আশালতা সেন, নিবেদিতা রায় প্রমুখের সঙ্গে। নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী লীলা নাগ প্রতিষ্ঠিত ‘নারীশিক্ষা মন্দির’ এবং তাঁর গড়ে তোলা ‘শান্তি কমিটি’র কার্যক্রমে সুফিয়া কামাল সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। এভাবে সমাজ পরিবর্তন, নারী অধিকার এবং মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর অংশগ্রহণ আরও সুদৃঢ় হয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলনে সুফিয়া কামাল প্রথম সারির একজন সক্রিয় সংগঠক ও অনুপ্রেরণাদায়ী কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
আশির দশক থেকেই ‘নারীর অধিকার মানবাধিকার’– এই নীতি সামনে রেখে তিনি কাজ করে গেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আইন, নীতি ও সামাজিক প্রথা পরিবর্তনের লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে গবেষণা, প্রচারাভিযান এবং জনমত গঠনে কাজ করেছে। আজও দেশের অধিকাংশ নারী সংগঠন সমঅধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাঁর আদর্শকে ধারণ করে সুপারিশমালা প্রণয়ন, নীতিগত সংস্কারের দাবি উত্থাপন এবং সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রমাণ করে– মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কেবল রাষ্ট্রীয় নীতির প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক অবিরাম সামাজিক আন্দোলন।
তাঁর আজীবন সংগ্রাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এক দিনের কাজ নয়। এটি প্রতিদিনের চর্চা, প্রতিনিয়ত অর্জনের বিষয়। সুফিয়া কামালের জন্মদিনে রইল প্রগাঢ় শ্রদ্ধা।
nতানিয়া খাতুন: মানবাধিকারকর্মী
[email protected]
- বিষয় :
- জন্মদিন
