ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

সংস্কার

মৌ‌লিক কোনো বাঁকবদ‌লের অঙ্গীকার বা‌জে‌টে নেই

মৌ‌লিক কোনো বাঁকবদ‌লের  অঙ্গীকার বা‌জে‌টে নেই
×

এম এম আকাশ

এম এম আকাশ

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বা‌জেট উত্তরা‌ধিকারসূ‌ত্রে প্রাপ্ত ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ঠেকা‌নো, স্থবির বি‌নি‌য়ো‌গে গ‌তিসঞ্চার, বেকারত্ব দূর এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রু‌তি পূরণের চ্যালেঞ্জ মোকা‌বিলার জন্য প্রণীত হ‌য়ে‌ছে ব‌লে দাবি করা হ‌চ্ছে। কিন্তু এর রাজ‌নৈ‌তিক শ্রেণি‌ভি‌ত্তি মৌ‌লিকভা‌বে ধনী অভিমুখী। ব‌্যবসায়ীরা একে ব‌্যবসাবান্ধব ব‌লে ইতোম‌ধ্যে অভিনন্দনও জা‌নি‌য়ে‌ছেন। কিছু জনতু‌ষ্টিমূলক কর্মসূচি ও নী‌তির প্রস্তাব করা হ‌য়ে‌ছে, যেগুলো অর্থের অভা‌ব, আন্তর্জা‌তিক চাপ ও বাস্তবায়ন ক্ষমতার ঘাটতির দরুন কেতাবেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি ব‌লে অধিকাংশ বি‌শেষজ্ঞ মত দি‌য়ে‌ছেন।

এ দেশের ধনী ব‌্যবসায়ী শ্রেণির ম‌ধ্যে দুই রকম পৃথকায়ন বিদ্যমান। এক‌দি‌কে র‌য়ে‌ছেন ক‌তিপয় বৃহৎ অলিগার্ক, যারা এত বড়– রাষ্ট্র তা‌দের কাছ থে‌কে ঋণ ও ট্যাক্স আদায় কর‌তে পা‌রে না। এমন‌কি তারা এখন মি‌ডিয়া, বাজার, প্রশাসন, বৈ‌দে‌শিক বা‌ণিজ্য, নির্বাচন, আদালত, রাজনৈ‌তিক ক্ষমতা– সবকিছুই স্বজন‌তোষণমূলক পুঁজিবাদী (ক্রোনি ক্যাপিটালিজম) কাঠা‌মোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ক‌রে নি‌জে‌দের সম্প‌দ‌কে দে‌শে-বি‌দে‌শে নিরাপ‌দে বি‌নি‌য়োগ/ পাচার ক‌রে‌ছেন বা কর‌ছেন। অন্যদিকে আছেন ব্যাপক ছোট ও মাঝা‌রি সম্প‌দের উদ্যোক্তা, যারা দেশেই উৎপাদনশীল বি‌নি‌য়োগ ক‌রে উপা‌র্জিত আয় অংশীজন‌দের সঙ্গে শেয়ার ক‌রে ধনী হ‌তে চান। এরা সাধারণত কর ও ঋণ ফাঁকি দেন না। তার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা-ঘ‌নিষ্ঠতাও তা‌দের নেই।

এ প্রেক্ষাপটে অর্থনী‌তি‌র ন্যূনতম গণতন্ত্রায়ন কর‌তে হ‌লে নিম্ন‌বিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং দেশ‌প্রেমিক প‌রিশ্রমী উদ্যোক্তা‌দের সঙ্গে শাসক শ্রেণির নতুন রাজ‌নৈ‌তিক‌ মৈত্রী‌ জোট গ‌ড়ে তুল‌তে হ‌বে। উৎপাদনশীল কৃষককে খাদ‌্য নিরাপত্তা রক্ষার জন‌্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ভর্তু‌কি দি‌তে হ‌বে। পোশাকশিল্প শুধু নয়; শ্রমঘন জুতা, ইঞ্জি‌নিয়া‌রিং, কৃ‌ষিভি‌ত্তিক নানা ধর‌নের রপ্তানিমুখী ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্প ইত্যাদি‌কে শিল্পায়‌ন কর্মসূচিতে অগ্রা‌ধিকার দি‌য়ে সাম‌নে আন‌তে হ‌বে। এদের জন্য বি‌শেষ উন্নততর মধ‌্যবর্তী প্রযু‌ক্তি (ইন্টারমিডিয়েট টেকনোলজি), সাশ্রয়ী সু‌দে পর্যাপ্ত ঋণ, সস্তা অবকাঠা‌মো (বিদ্যুৎ, গ্যাস, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ভূমি), স‌র্বোপরি অভ‌্যন্তরীণ বাজারের সু‌যোগ বা ‘ওয়ান স্টপ সা‌র্ভিস’-এর ব্যবস্থা কর‌তে হ‌বে। অন্তত এ ল‌ক্ষ্যে দৃশ‌্যমান কাজ শুরু কর‌তে হ‌বে।

এগু‌লো তখনই করা সম্ভব হ‌বে যখন নী‌তিনির্ধারকরা স্বাধীনভা‌বে সকল বৈ‌দে‌শিক গোষ্ঠীর আর্থিক চাপ ও স্থানীয় অলিগার্ক বা এক‌চে‌টিয়া হাউসগু‌লোর চাপ মোক‌াবিলা ক‌রে তা‌দের সঙ্গে ক‌ঠিন আচরণ বা নি‌দেন প‌ক্ষে ক‌ঠোর দর কষাক‌ষি কর‌তে পার‌বেন। এ ক্ষে‌ত্রে ভূ-রাজনী‌তি‌তে একজন‌কে দি‌য়ে আরেকজ‌নের চাপ ঠেকা‌নোর কৌশল শিখ‌তে হ‌বে। বি‌দেশি‌ অন‌্যায় চাপ প্রয়োগকারী‌দের ম‌ধ্যে বি‌ভেদ আর দেশীয় উৎপাদনশীল‌ শ‌ক্তিগু‌লোর ম‌ধ্যে রাজ‌নৈ‌তিক ঐক্য গঠন ছাড়া এটা সম্ভব হ‌বে না।

সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা
সর্বজনীন শিক্ষা, স্বাস্থ‌্য ও ন্যূনতম আয়‌ নি‌শ্চিত করার ল‌ক্ষ্যে এখন থে‌কেই দৃশ‌্যমান পদ‌ক্ষেপ নি‌তে হ‌বে। এগু‌লো প্রথ‌মে সবর্নিম্ন ও প্রা‌ন্তিক ২০ শতাংশের জন্য নি‌শ্চিত কর‌তে হ‌বে। এতে নিচের দি‌কে ভোগ বাড়‌বে। তা‌তে তারা যেসব পণ্য ভোগ ক‌রেন, তার দাম স্বল্প মেয়াদে বাড়তেও পা‌রে। কিন্তু সেটা ভোগচা‌লিত প্রবৃ‌দ্ধ‌িকে সাহায্য কর‌বে; অসমতা কমা‌বে। প্রবাসী শ্রমিকদের যথাযথ নিরাপত্তা এবং তা‌দের শ্রমের উচ্চ রিটার্ন নি‌শ্চিত করার জন্য বি‌শেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার পাশাপাশি তা‌দের‌ পাঠা‌নো বৈ‌দে‌শিক মুদ্রার স্বচ্ছ অন্তঃপ্রবাহের ব‌্যবস্থা কর‌তে হ‌বে। এ অর্থের স‌ঠিক বি‌নি‌য়ো‌গের ব‌্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। 
এ কথা ঠিক যে, এগু‌লো এক‌টি বা‌জে‌টে একবা‌রে করা সম্ভব নয়। কিন্তু গ‌তিমুখ (ডাইরেকশন) নির্ধারণ করা সম্ভব। পলিটিক্যাল অথরিটি বা রাজ‌নৈ‌তিক কর্তৃত্বকে সে জন্য সফল সংস্কারক দে‌শ যেমন– ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বৈ‌দে‌শিক চাপবি‌রোধী ও কিছুটা জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে দ‌লের ভেত‌রে ও বাইরে গণতা‌ন্ত্রিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নি‌শ্চিত করতে হ‌বে। 

পা‌রিবা‌রিক কার্ড কর্মসূচি
ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ কতটুকু জোগাড় হবে, কা‌কে তা দেওয়া হ‌বে, কীভা‌বে কে উপকার‌ভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া‌কে নজরদারি বা ম‌নিটর কর‌বেন, তার ওপর নির্ভর কর‌বে এটি স্বজন‌তোষণমূলক কর্মসূচি‌তে প‌রিণত হ‌বে, না‌কি প্রকৃত হত‌দরিদ্র ২০ শতাংশের কা‌ছে‌ পৌঁছা‌বে। ত‌াই এর একটা মধ‌্যবর্তী মূল‌্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি এবং স্বচ্ছতা নি‌শ্চিত করা দরকার। 

কর প্রশাস‌ন
রাজস্ব কাজকর্মকে প‌রিপূর্ণভাবে স্বচ্ছ ও জবাব‌দিহির অধী‌নে না এনে যত রকম ভালো কর প্রস্তাবই নেওয়া হোক না কেন, তা করদাতা‌দের কা‌ছে গ্রহণযোগ্য হ‌বে না। তা ছাড়া প্রত‌্যক্ষ করের অনুপাত বাড়‌ল কিনা, এটিও দেখ‌তে হ‌বে। তাই করজাল বিস্তৃত করার আগে জা‌লের বড় ছিদ্রগু‌লোও বন্ধ করা জরুরি। জাল যেখা‌নে ফেলা হ‌য়ে‌ছে, সেখান থে‌কে মাছ ধর‌তে বা কর আদা‌য়ে ব্যর্থ হ‌য়ে ছোট‌ মাছদের‌ যত্রতত্র জা‌লে আনা গ্রহণযোগ্য হ‌বে না। এটা বজ্র আঁটু‌নি ফস্কা গেরো বা নেহাত প্রস্তু‌তিহীন হুঙ্কা‌রে প‌রিণত হওয়ার আশঙ্কা র‌য়ে‌ছে। দোকানদার‌দের ওপর কর আরোপ তার
প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বা‌জেট বাস্তবায়‌নের ভ‌বিষ‌্যৎ
আগেই ব‌লে‌ছি, এই বা‌জে‌টে বড় কোনো প্রত্যাশার অবকাশ নেই। এটি একটি নাজুক অবস্থা সামলা‌নার বা‌জেট। সে ক্ষে‌ত্রে অর্থমন্ত্রীও দেখা যা‌চ্ছে য‌থেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নন। অন্তত সততার সঙ্গে নী‌তিগু‌লো বাস্তবায়‌নে দুই বছ‌রের মতো অতি‌রিক্ত সম‌য়ের কথা নি‌জেই তি‌নি ব‌লে‌ছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনটি ব্যাপার দে‌খে আমার ম‌নে হ‌চ্ছে, নতুন কোনো ক‌ঠোর মৌ‌লিক বাঁকবদ‌লের অঙ্গীকার এই বা‌জে‌টে নেই। য‌দিও বিএনপি ইতোমধ্যে‌ দুজন সাবেক ক‌থিত বামপন্থি‌কে অর্থ ও প‌রকিল্পনা ক্ষে‌ত্রে উচ্চপদ উপহার দি‌য়ে‌ নি‌জে‌দের অন্তর্ভু‌ক্তিতা প্রদর্শনের প্রয়াস পে‌য়ে‌ছে এবং ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিও কিছুটা সমালোচনামূলক বা ক্রিটিক্যাল অবস্থান গ্রহণ ‌ক‌রেছে, এখনও ইসলামী ব্যাংক বা তার অন্যতম ‘গুপ্ত’ অংশীজন জামা‌য়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ঠিক কতটুকু দ্বন্দ্বমুখর হ‌বে– স্পষ্ট হ‌য়ে ওঠেনি।  
তাই রাজ‌নৈ‌তিক অর্থনী‌তির দৃ‌ষ্টি‌তে ম‌নে হয় বা‌জে‌টে যা-ই লেখা থাকুক, প্রথম বা‌জে‌টের শুরু‌তেই বা চল‌তি ভাষায় প্রাতঃকালেই তিন‌টি অশুভ লক্ষণ পূর্ব দিগ‌ন্তে দৃশ্যমান: (১) বাংলা‌দেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়া ঠিক হয়নি, (২) মা‌র্কিন যুক্তরা‌ষ্ট্রের সঙ্গে অসম বা‌ণিজ্য চু‌ক্তি মেনে ‌নি‌য়ে তার অন্যতম কু‌শীলব‌কে পুরস্কৃত করা হ‌য়ে‌ছে এবং (৩) পদ্মা ব্যারাজ নাম দি‌য়ে বির্তকিত এক‌টি মেগা প্রকল্প অস্বচ্ছভা‌বে গ্রহণ করা হ‌য়ে‌ছে।

বিএন‌পি সরকা‌রের উচিত এগু‌লো জাতীয় সংস‌দে আলোচনা ক‌রে সং‌শোধন করা।

এম এম আকাশ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক
 

আরও পড়ুন

×