ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সাদাকালো

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আ.লীগ নিয়ে ঢাক ঢাক গুড় গুড়

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আ.লীগ নিয়ে ঢাক ঢাক গুড় গুড়
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৪০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ১২:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল এবং বহু জাতীয় গৌরবের স্রষ্টা হলেও আওয়ামী লীগের নাম এখন সাবধানে নিতে হয়। একটি ‘আন্দোলনের চাপে’ অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার দলটির ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ করে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিএনপিও সেই নিষেধাজ্ঞা সংসদে অনুমোদন করে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ না হলেও দলটির স্লোগান বা সংশ্লিষ্টতা দেখলেই পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

কথাগুলো মনে এলো সোমবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার একটা প্রশ্ন শুনে। সমকালের খবর অনুসারে, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন– স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করতে পারবেন কিনা। এ একই প্রশ্ন কোনো টকশোতে তুললে তিনি হয়তো নতুন করে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা পেতেন। যেমন তিনি ইতোমধ্যে কয়েকটি টকশোতে গিয়ে দুই বছর আগে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করায় সামাজিক মাধ্যমে সেই ট্যাগ পেয়েছেনও। এর সঙ্গে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী যে রুমিন ফারহানার প্রশ্নের উত্তর দেননি, তার কোনো সংযোগ আছে কিনা, বলা কঠিন। তবে কিছু সন্দেহ তো থেকেই যায়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হ্যাঁ বা না কিছু একটা বলতে পারতেন। বস্তুত এটিই দস্তুর। এভাবে প্রশ্নকারীকে সম্মান জানানো হয়; জনগণেরও বিষয়টা জানার অধিকার আছে। রুমিন দীর্ঘদিন বিএনপি করেছেন; দলটির কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন; একাদশ সংসদে দলটির মনোনয়নে সংরক্ষিত আসনে এমপিও হয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণে রুমিনের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন তিনি প্রত্যাশা করেননি।
গত ১০ জুন বুধবার প্রকাশিত সমকালের আরেক প্রতিবেদন বলছে, আগামী আগস্টে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সে ক্ষেত্রে অক্টোবরের শুরুর দিকে ভোট কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে সংস্থাটি। মঙ্গলবার সংসদে মির্জা ফখরুল এমন কথাই বলেছেন। কিন্তু নির্বাচনের সময় নিয়ে কথা বললেও মির্জা ফখরুল নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর অংশগ্রহণের বিষয়টি কেন পরিষ্কার করেননি?

কেউ হয়তো বলতে পারেন, দলীয় প্রতীকভিত্তিক নির্বাচন বলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ওই নিষেধাজ্ঞার কোনো সুযোগ নেই। গত ২ জুন সমকালেরই এক খবরে বলা হয়েছিল, স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং জেলা পরিষদের জন্য যে পৃথক আইন-বিধি প্রণয়ন করা হচ্ছে, তাতে আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওইসব নির্বাচনে অংশ নেওয়া ঠেকানোর আয়োজন থাকছে। গত ১০ জুন প্রদত্ত ইসির বক্তব্য অনুযায়ী, সেই আইন ও বিধিমালার খসড়া প্রণয়ন এখনও শেষ হয়নি। তা শেষ হলে কমিশন সভায় খসড়া অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। অর্থাৎ মূল চাবিকাঠি সরকারেরই হাতে। এ কারণেই রুমিনের প্রশ্নের উত্তর না পাওয়াটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। 

অবশ্য গত ৯ জুন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান একই বিষয়ে বেশ স্পষ্ট কিছু কথা বলেছেন। তাঁকে সেদিন এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী দেশে আছেন, তাদের কেউ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে সরকার সেই স্পেস বা সুযোগ দেবে কিনা?’ জবাবে উপদেষ্টা বলেছেন, ‘কোনো রকম কোনো সমস্যা নেই। মানে একজন ব্যক্তি যদি নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তিনি যদি আওয়ামী লীগেরও হন, কারণ, এটা নির্দলীয়।’ তাঁর মতে, সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায়, প্রচারণার সময় আওয়ামী লীগের দলীয় বক্তব্য সামনে আনলেই কেবল সমস্যা হতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, ‘ব্যক্তি হিসেবে যে কেউ যদি ক্রাইটেরিয়া যা যা আছে সেটি ফুলফিল করতে পারেন; তিনি যদি মনে করেন যে তিনি নির্বাচন করবেন তিনি নির্বাচন করতে পারেন। সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়ার কোনো কারণ নেই।’

ডা. জাহেদ শুধু তথ্য উপদেষ্টা নন; প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টাও বটে। অতএব তাঁর কথা নিছক ব্যক্তিগত নয়, সরকারেরও কথা। প্রতি মঙ্গলবার সচিবালয়ে তিনি যে সংবাদ সম্মেলন করেন তা সরকারেরই কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত তুলে ধরার জন্য করা হয়। দলের মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে পারতেন। রাজনৈতিকভাবেও তা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ হতো। এ অবস্থায় নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা যেমন ভোটকৌশল ঠিক করতে পারেন, তেমনি ভোটাররাও নির্বাচন নিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। 
প্রশ্ন হচ্ছে, রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কি বিষয়টি নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতারই ইঙ্গিত দিলেন? বস্তুত বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকের অন্য সব নাগরিকের মতোই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা নিজের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার অধিকার আছে। একটা গণতান্ত্রিক এবং সংবিধানের প্রতি অনুগত সরকার হিসেবে বিএনপি কি তা খর্ব করতে পারে?

বিশেষত গত সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে কার লাভ বেশি, তা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অজানা থাকার কথা নয়। বিএনপির অনুগ্রহ ছাড়া যে দল সংসদে ২০টি আসনও পায়নি, সেই জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে সংসদের শক্তিশালী বিরোধী দল। বিশ্লেষকদের অনেকেই একমত– এ ভোট গেছে বিএনপিরই পকেট থেকে, যেহেতু দুই দল বরাবর একই সমর্থক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে রাজনীতি করেছে। বিএনপির অনেক এমপি স্বীকারও করেছেন, আওয়ামী লীগের ভোট না পেলে তাদের বিজয় হাতছাড়া হতো। বিএনপি কি বারবার আওয়ামী লীগের ভোট পেতে থাকবে? 
একটা গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচনের পরও দেশের রাজনীতি যে এখনও স্থিতিশীল হয়নি– সেটি তো সত্য। এই চিন্তা অমূলক নয় যে, জামায়াত প্রশ্নে বিএনপি এখনও স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি বলেই এ অস্থিশীলতা। তবে আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে এ বিষয়ে টেকসই সিদ্ধান্ত নেওয়া যে কঠিন– সেটিও সত্য। তাই আওয়ামী লীগ বিষয়ে ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছেড়ে বিএনপি এবার ওই বাস্তবতা স্বীকার করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিক, এটাই প্রত্যাশা।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×