ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

রাইট টার্ন

বাংলাদেশ কি প্রতিশোধের চক্র ভাঙতে পারবে

বাংলাদেশ কি প্রতিশোধের চক্র ভাঙতে পারবে
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ১১:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিছু বক্তব্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বিতর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর জাতীয় প্রশ্নেরও জন্ম দিতে পারে। যেমন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছেন, ‘প্রতিশোধ নিলে হাড্ডি জোড়া লাগবে না, ব্যথাও কমবে না।’

বাক্যটি শুধু তারেক রহমানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার গভীর সত্য সামনে নিয়ে এসেছে, যা নিয়ে আমরা সচেতনভাবে কথা বলি না। বক্তব্যটি মূলধারার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিও এই আলোচনায় যুক্ত হলে দীর্ঘদিনের অসমাপ্ত একটি জরুরি কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে। কারণ স্বাধীনতার পর থেকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে প্রতিশোধ, প্রতিহিংসার সংস্কৃতি।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কঠিন সময়েই রাজনৈতিক বিভাজনের সূচনা হয়েছে। এরপর পঁচাত্তরের মর্মান্তিক ঘটনা, সামরিক শাসনের বিভিন্ন অধ্যায়, সংঘাতপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাজনীতি, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরূকরণ। প্রতিটি অধ্যায়ে কোনো না কোনো পক্ষ নিজেদের নিপীড়নের শিকার হিসেবে দেখেছে। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় বিচার ও প্রতিশোধের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। সুশাসন থেকেছে সুদূরপরাহত।

এই দীর্ঘ সংঘাতের সবচেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছে জনসাধারণ। কারণ রাজনৈতিক অর্থ বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের ঝুঁকি, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ব্যাঘাত। বিনিয়োগকারীরা শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয়; রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও নীতির ধারাবাহিকতাও বিবেচনায় নেন। প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার রাজনীতির ডামাডোলে সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি থেকেছে অধরা। ফলে অর্থনীতি বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগোলেও সম্ভাবনার পূর্ণ উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি।

কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও প্রবাসীরা বারবার দেশের সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিয়েছেন। প্রশ্ন থেকে যায়, রাষ্ট্র আরও স্থিতিশীল হলে; রাজনৈতিক শক্তিগুলো পরস্পরকে ধ্বংস করার পরিবর্তে প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকলে আমরা আরও দ্রুত এগোতে পারতাম কিনা?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাবাসের পর প্রতিশোধের পরিবর্তে পুনর্মিলনের পথ বেছে নিয়েছিলেন। রুয়ান্ডা গণহত্যার বিভীষিকা ভুলে না গিয়েও দেশ ও জনগণের স্বার্থে পুনর্গঠনের পথে এগিয়েছে। স্পেন দীর্ঘ একনায়কতন্ত্রের পর গণতন্ত্রে রূপান্তরের সময় অতীতের ক্ষতকে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক যুদ্ধের প্রধান অস্ত্রে পরিণত হতে দেয়নি। এসব উদাহরণ হয়তো নিখুঁত নয়, কিন্তু শিক্ষা দেয়– অতীতকে স্মরণ করা যায়; অন্যায়ের বিচার করা যায়, কিন্তু ভবিষ্যৎকে প্রতিশোধের হাতে বন্দি করে রাখা ঠিক নয়।

তারেক রহমানের বক্তব্য সেই ধরনের রাজনৈতিক দর্শনের ইঙ্গিত বহন করে, যেখানে প্রতিশোধের চেয়ে পুনর্গঠন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিচার ও প্রতিশোধের মৌলিক পার্থক্যকে সুস্পষ্ট করেছেন। এখন দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে অন্তরের কথা অন্তরে চেপে রেখে মানুষের কল্যাণে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসা থেকে বেরিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে। 

আমরা জানি, বিচারের লক্ষ্য সত্য উদ্ঘাটন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। অন্যদিকে প্রতিশোধের লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেওয়া। বিচার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে; প্রতিশোধ প্রতিষ্ঠানকে গোষ্ঠীগত স্বার্থের হাতিয়ারে পরিণত করার ঝুঁকিতে ফেলে।

প্রতিশোধের চক্র ভাঙার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আত্মসংযম। ইতিহাস বলে, প্রতিশোধ নেওয়া সহজ; প্রতিশোধ না নেওয়া কঠিন। কারণ সেখানে বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। তাৎক্ষণিক আবেগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে বিবেচনায় নিতে হয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিতে আত্মসংযমকে অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। যারা আপস, সহাবস্থান বা পুনর্মিলনের কথা বলে, তাদেরকে প্রায়শ পরাজিত বা ভীত হিসেবে চিত্রিত করা হয়। অথচ বাস্তবতা উল্টো। প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ না নেওয়া অনেক বড় শক্তির পরিচয়। সংযম দুর্বলতার নয়; আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ। সহনশীলতা পরাজয়ের নয়; পরিপক্বতার লক্ষণ।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য যদি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত অবস্থান হয়ে ওঠে, তাহলে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। কারণ ঐক্যবদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে হলে অতীতের ক্ষতকে যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনই সেটাকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে না।

বস্তুত প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ বিচারহীনতা নয়; বরং বিচারকে প্রতিশোধ থেকে পৃথক করা। কেউ যদি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তার বিচার হতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করতে হবে। বিচার হবে আইনের আওতায়, প্রমাণের ভিত্তিতে এবং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

রাষ্ট্রকে এই বার্তা দিতে হবে– অতীতের অপরাধের বিচার হয়েছে, বর্তমানের অপরাধের বিচার হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে বিচার হবে। আরেকটি বার্তাও স্পষ্ট হতে হবে– অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ এবং সহাবস্থানের রাজনীতির প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। কারণ বিচার রাষ্ট্রকে সুস্থ করে; প্রতিশোধ রাষ্ট্রকে বিভক্ত করে।

পথটি সহজ নয়। কারণ প্রতিশোধের চক্র ভাঙতে হলে কাউকে না কাউকে প্রথমে সংযম দেখাতে হয়। কাউকে না কাউকে বলতে হয়– আমি পারি, কিন্তু করব না। প্রতিপক্ষকে আঘাত করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে সেখান থেকে সরে আসতে হয়। ইতিহাস বলে, এ ধরনের সংযম দুর্বলতা নয়; বরং আত্মবিশ্বাস, দূরদর্শিতা ও পরিপক্বতার পরিচায়ক। 

তরুণ জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থান চায়, উদ্যোক্তারা স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ চায় এবং জনসাধারণ শান্তি চায়। প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে হলে এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে কিন্তু শত্রুতা থাকবে না; মতভেদ থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না; বিচার থাকবে কিন্তু প্রতিশোধ থাকবে না।

প্রশ্নটি তাই সমগ্র জাতির জন্য, আমরা কি এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে অপরাধের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, কিন্তু রাজনীতি প্রতিশোধমুক্ত হবে? যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিপন্ন করবে না? যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু নয়; প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হবে? যেখানে জাতীয় স্বার্থ ব্যক্তিগত ও দলীয় প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে?

বাংলাদেশের প্রথম ৫৫ বছর কেটেছে অনেক অর্জন, ব্যর্থতা, অমীমাংসিত ক্ষতের মধ্য দিয়ে। আগামী ৫০ বছরে রাষ্ট্র কোথায় যাবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে আমরা বিচার ও প্রতিশোধের মধ্যে পার্থক্য করতে শিখলাম কিনা তার ওপর।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
 

আরও পড়ুন

×