ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

৪ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা

বগুড়ায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্র চাপের মুখে

আরেক পত্রিকার প্রকাশনা বাতিলের আবেদন

বগুড়ায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্র চাপের মুখে
×

প্রতীকী ছবি

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৯:৫৩ | আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ | ১০:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘এবার সাংবাদিকদের উপদেশ দিলেন রাস্তাকাণ্ডে বিতর্কিত প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম’ শীর্ষক একটি ফটোকার্ড প্রচারের অভিযোগে দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের সম্পাদকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ‘ঢাকার জেলা প্রশাসক নিয়োগে ৩০ কোটি টাকা লেনদেন, একই সিন্ডিকেট জড়িত’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জেরে বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক উত্তরকোণ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিলের আবেদন করা হয়েছে।

প্রথম ঘটনায় মামলা করেছেন বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ ও স্থানীয় দৈনিক মহাস্থান পত্রিকার সম্পাদক তানভীর আলম রিমন। উত্তরকোণের প্রকাশনা বাতিলের আবেদন করেন বগুড়া শহরের চারমাথা ভবের বাজার এলাকার আবুল কালাম আজাদ এবং শিবগঞ্জ উপজেলার আলীগ্রাম এলাকার আনোয়ারুল ইসলাম সুমন।

উত্তরকোণের পত্রিকার প্রকাশক বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য সাবেক এমপি ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু। সম্পাদক হেলালুজ্জামানের ছেলে সাহেদুজ্জামান সিরাজ বিজয়। 

অগ্রযাত্রা পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলার বাদী তানভীর আলম রিমন নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। তবে মামলা করার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী তাঁকে কোনো নির্দেশনা দেননি বলে জানান তিনি। স্থানীয় রাজনীতিবিদরা বলছেন, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে রিমনের ঘনিষ্ঠতা আছে। গত মে মাসে রিমন শিবগঞ্জ উপজেলার বুড়িগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হয়েছেন। তিনি বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষও। 

গত ১৫ জুন অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের বিরুদ্ধে বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সদর আমলি আদালতে লিখিত আবেদনের পর বিচারক মেহেদী হাসান সংশ্লিষ্ট থানাকে অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দেন। মামলার চার আসামি হলেন অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের প্রকাশক ও সম্পাদক মেহেদী হাসান, বার্তা সম্পাদক আশরাফ আলী ফারুকী, প্রতিবেদক সালেহ কায়সার ও বগুড়া প্রতিনিধি শামসুল আলম।

আরজিতে বলা হয়, বিবাদীরা কোনো ধরনের নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতিমন্ত্রীকে ঘিরে নামে প্রতিবেদন প্রকাশ ও ফটোকার্ড প্রচার করেছেন। রিমনের আইনজীবী আবদুল ওহাব জানান, বাদীর আবেদন ও প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। 

তানভীর আলম সমকালকে বলেন, ‘ওরা পেশাদার সাংবাদিক না। ওরা আমার বিরুদ্ধেও নিউজ করেছে। আমি একজন বিএনপির কর্মী। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। তবে উনি মামলা করতে বলেননি।’ 

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম হোসেন গতকাল বলেন, ‘আদালতের আদেশ এখনও পাইনি। পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

পত্রিকার প্রকাশনা বাতিলের আবেদন

গত ২৭ এপ্রিল বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক উত্তরকোণ পত্রিকায় ‘ঢাকার জেলা প্রশাসক নিয়োগে ৩০ কোটি টাকা লেনদেন, একই সিন্ডিকেট জড়িত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পাঁচ দিন পর বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানের কাছে পত্রিকাটির প্রকাশনা বাতিলের আবেদন করেন বগুড়া শহরের চারমাথা ভবের বাজার এলাকার আবুল কালাম আজাদ এবং শিবগঞ্জ উপজেলার আলীগ্রাম এলাকার আনোয়ারুল ইসলাম সুমন। 

জানতে চাইলে আনোয়ারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘আমি সচেতন নাগরিক হিসেবে এটা করেছি। আমার মনে হয়েছে, এই মিথ্যা খবরে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। একজন ভালো লোকের মানহানি হয়েছে। দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ জন্যই বিএনপির একজন সাধারণ কর্মী ও ভোটার হিসেবে এটা করেছি।’ 

আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী (মীর শাহে আলম) ও আমার বাড়ি পাশাপাশি ইউনিয়নে। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় আছে। তবে প্রতিমন্ত্রী আমাদের আবেদন করতে বলেননি। ঘটনার পর প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়নি, কোনো কথাও হয়নি।’ 

উত্তরকোণ পত্রিকার সম্পাদক সাহেদুজ্জামান সিরাজ বিজয় বলেন, ‘পত্রিকায় যখন কোনো খবর প্রকাশিত হয়, তখন সেখানে সূত্র উল্লেখ থাকে। আমরা যারা বগুড়া থেকে পত্রিকা বের করি, অনেক ক্ষেত্রে ঢাকার পত্রিকায় যেটা প্রকাশিত হয়, সেগুলো পরে প্রকাশ করি। ওই রিপোর্টটি শীর্ষনিউজের অনলাইন সংস্করণ থেকে নিয়ে প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে সূত্রও উল্লেখ ছিল।’ তিনি বলেন, ‘প্রকাশনা বাতিলের আবেদন করলে শীর্ষনিউজের প্রকাশনা বাতিল হতে পারে। কিন্তু তারা সেটা না করে আমার পত্রিকার প্রকাশনা বাতিলের আবেদন করল।’ 

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আবেদন পেয়েছি। এ বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের মোবাইল ফোনে গত বুধবার কল করা হয়। তবে তিনি ধরেননি। পরে বিষয়বস্তু লিখে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। তিনি জবাব দেননি। 

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ৯ মামলা

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শিবগঞ্জ থানা ও আদালতে ৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে আদালতে পাঁচটি ও থানায় চারটি মামলা হয়। এসব মামলায় জুলাই অভ্যুত্থানের সময় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মারধর, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। তবে আদালতে করা পাঁচটির মধ্যে তিনটি ও থানায় করা চারটির মধ্যে একটি মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এর চার মামলার বাদী বেলাল শেখ, আলামিন, শামিউল আলম ও সাঈদ হোসেন। 

আদালতে থাকা একটি মামলায় তিন সাংবাদিককেও আসামি করা হয়। তারা হলেন একুশের বাণী পত্রিকার অনন্ত সেলিম, অনলাইন পত্রিকা বগুড়া পেজ-এর রাসেল আহম্মেদ ও জনতা নিউজের রিপন মিয়া। 

এ মামলার বাদী গাবতলী উপজেলা সদরের রফিকুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, এই সাংবাদিকরা আওয়ামী লীগের দোসর ছিলেন। এ জন্য তাদের নামে মামলা করা হয়।

মামলার আসামি সাংবাদিক অনন্ত সেলিম বলেন, ‘আমার নামে কেন, কী কারণে মামলা করেছিল তা বোধগম্য নয়। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ নয়।’ 

শিবগঞ্জ থানার ওসি শাহীনুর রহমান সমকালকে বলেন, আদালতের তিনটি ও থানার একটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অন্য মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। 
নিজের বংশ ও দুই ছেলের নামে ইউনিয়নের নামকরণ করে সম্প্রতি আলোচনায় আসেন বগুড়ার শিবগঞ্জের এমপি ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এ নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয় এবং ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিতে গিয়ে সংসদকে তিনি জানান, তাঁর বংশ ও ছেলেদের নবগঠিত ইউনিয়নের নামকরণ ছিল মিরাকল। 

আরও পড়ুন

×