ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

তহবিল সংকটে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের কাজে ধীরগতি

তহবিল সংকটে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের কাজে ধীরগতি
×

করিডোরে পাতা শয্যায় চিকিৎসাধীন এক শিশুর পাশে তাঁর মা। শুক্রবার শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে

বিপ্লব হাসান হৃদয়, শরীয়তপুর

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০৭:৫২

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে গত শনিবার রাতে ভর্তি হয়েছেন ষাটোর্ধ্ব রশিদ ফকির। রোগীর চাপ থাকায় ওয়ার্ডে শয্যা মেলেনি সদর উপজেলার চিকন্দি ইউনিয়নের ছোট সন্দীপ এলাকার এই বাসিন্দার। গতকাল রোববার দুপুরে রশিদ ফকির বলেন, বাধ্য হয়ে ওয়ার্ডের বাইরে মেঝেতে শুয়েই স্যালাইন নিচ্ছেন। সামান্য দূরেই শৌচাগার। সেখান থেকে সারাক্ষণ দুর্গন্ধ আসছে। অসুস্থ অবস্থায় এখানে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। 

এই চিত্র গতকাল হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বেশির ভাগের। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে এদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন ৪২৬ জন। যাদের ১০৪ জনই আগের ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন। জেলার প্রায় ১৪ লাখ মানুষের প্রধান ভরসা এই হাসপাতালে শয্যাসংকট প্রকট। পাশাপাশি রয়েছে নানামুখী সংকটও। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ১৯৮৫ সালে জেলা শহরে ৩০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে সদর হাসপাতালটি। ১৯৯০ সালে সেটি ৫০ শয্যায় ও ২০০৩ সালে এটি ১০০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত হয়। ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর এই হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। একই বছরের ডিসেম্বরে ৯ তলাবিশিষ্ট ২৫০ শয্যার ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালে জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তহবিল সংকটে কাজ এখনও শেষ হয়নি।

জেলা গণপূর্ত বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, নতুন হাসপাতাল নির্মাণের জন্য শুরুতে বরাদ্দ হয় ৩৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ফোরকান আহমেদ খান কোম্পানি লিমিটেড। তাদের ২০২৪ সালের জুনে কাজ শেষ করার কথা ছিল। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে বরাদ্দ করা হয় ৪৯ কোটি টাকা। তাদের ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে।

হাসপাতালটির পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে জানা গেছে, গত এক মাসে প্রায় ১০ হাজার রোগী বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া বহির্বিভাগে দিনে সেবা নিয়েছেন গড়ে প্রায় এক হাজার রোগী। 

কয়েকদিন হাসপাতাল ঘুরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা মিলেছে। দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি বিভাগেই শয্যার কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি। অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কেউ অবস্থান করছেন ওয়ার্ডের বাইরে বারান্দায়, কেউ করিডোরে, আবার কেউ সিঁড়ির পাশে। কাউকে আবার অপরিচ্ছন্ন শৌচাগারের সামনেও জায়গা করে নিতে হয়েছে। এতে রোগীদের চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

গত শুক্রবার শিশু ওয়ার্ডের বারান্দায় দেখা যায়, ১৭ মাসের আয়ানের নিউমোনিয়া। তাঁকে বুকে জড়িয়ে বসে আছেন মা সানজিদা অ্যানি। ছেলেকে গত বুধবার হাসপাতালের ভর্তি করলেও শিশু ওয়ার্ডে শয্যা খালি ছিল না। বাধ্য হয়ে বারান্দায় শয্যা পেতেই চিকিৎসা করাচ্ছিলেন আয়ানের। 

সানজিদা অ্যানির বাড়ি নড়িয়া উপজেলার ডগ্রি এলাকায়। প্রচণ্ড গরমে বারবার ঘেমে উঠছিল তাঁর শিশু সন্তানের শরীর। বৈদ্যুতিক পাখা না থাকায় ছেলেকে কোলে নিয়ে এক হাতে পাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন সানজিদা। সন্তানের কষ্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে নিজের অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের গল্প।

সানজিদা বললেন, ছেলেকে নিয়ে সদর হাসপাতালে এসেছিলেন অন্তত একটি শয্যা পাবেন সেই আশায়। কিন্তু রোগীর চাপে ঠাসা হাসপাতালে তাদের জুটেছে বারান্দার কোনা। বৃষ্টি হলে পানিতে ভিজে যায় বালিশ, চাদর ও কাপড়চোপড়। তাঁর ভাষায়, ‘বাচ্চাটা অসুস্থ, তাই কষ্ট হলেও এখানে থাকতে হচ্ছে। গত রাতে বৃষ্টি শুরু হলে বারান্দা দিয়ে পানি এসে সব ভিজিয়ে দেয়। তখন ছেলেকে কোলে নিয়ে ওয়ার্ডের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারপরও চিকিৎসার আশায় পড়ে আছি।’

শিশু ওয়ার্ডের নার্সিং ইনচার্জ শিরিন ঝিনুক বলেন, ‘আমরা সীমিত জনবল নিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে, অনেক সময় সবাইকে দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে কিছু স্বজন ক্ষুব্ধ হয়ে আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেন।’

শিরিন ঝিনুকের দেওয়া তথ্যমতে, শিশু ওয়ার্ডে অনুমোদিত শয্যা মাত্র ১০টি। অথচ সেখানে চিকিৎসাধীন ৫৭ জন। যে কারণে অধিকাংশ রোগীকেই বারান্দা বা ওয়ার্ডের খালি জায়গায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। 

বিপুল রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক মাহামুদুর রহমান শান্তর কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরে পড়ে। তিনি বলেন, ‘ভাই, আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে নেমেছি। এভাবে এত মানুষকে কিভাবে চিকিৎসা দেওয়া যায় ? আমরাও তো মানুষ। প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার মানুষ এখান থেকে চিকিৎসা নেন।’ 

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মিতু আক্তার বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এখানে শয্যা সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমিত শয্যা ও অবকাঠামোগত সমস্যার মধ্যেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের প্রতিনিয়ত চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। তবে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল চালু হলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে তারা আশাবাদী।

একই রকম মন্তব্য করেন শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন আহমেদ। তিনি মোবাইল ফোনে বলেন, ২৫০ শয্যার এই আধুনিক হাসপাতাল চালু হলে শয্যা সংকট কেটে যাবে। পুরো জেলার স্বাস্থ্যসেবা খাতেও পরিবর্তন আসবে। হাসপাতালে আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, এমআরআইসহ উন্নত রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা থাকবে। ফলে রোগীরা দ্রুত কার্যকর চিকিৎসাসেবা পাবেন।

এ বিষয়ে শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, তহবিল জটিলতার কারণে নির্মাণাধীন হাসপাতালের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে এখন ৮০ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন

×