ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

সরকারি জমি ও পুকুর দখল করে চেয়ারম্যানের পার্ক ও বৈঠকখানা

সরকারি জমি ও পুকুর দখল করে চেয়ারম্যানের পার্ক ও বৈঠকখানা
×

কোটি টাকার সরকারি জমি ও পুকুর দখল করে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ সদর ইউপি চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পার্ক ও হোটেল সমকাল

আমিরুল হক, নীলফামারী 

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে কোটি টাকার সরকারি জমি ও পুকুর দখল করে দোকান, হোটেল ও ব্যক্তিগত অফিস নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, হাট-বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের সরকারি অর্থ ব্যবহার করে একটি খাস পুকুর ভরাট করে তিনি গড়ে তুলেছেন মিনি পার্ক ও কবুতরের খামার।

শুধু জবরদখলই নয়, প্রভাবশালী এই চেয়ারম্যান নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব কিশোর গ্যাং। যার ভয়ে স্থানীয়রা মুখ খুলতে সাহস পান না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরও এই অবৈধ দখল উচ্ছেদে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলা ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ প্রধান বাজারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ৬৭ দাগে মোট দুই একর ৬৩ শতাংশ সরকারি জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান সড়কের পাশে ১৫ শতাংশ এবং একটি পুকুরের ২৫ শতাংশসহ মোট ৪০ শতাংশ জমি রাতের আঁধারে দখল করে নিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান। যার বর্তমান বাজার মূল্য অন্তত ১৫ কোটি টাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কিশোরগঞ্জ গরুর হাটের পাশেই প্রধান সড়ক ঘেঁষে অবৈধভাবে দখলে নেওয়া ১৫ শতাংশ জায়গায় চেয়ারম্যানের দুটি দোকান ও বন্ধু হোটেল নামের একটি বড় রেস্তোরাঁ রয়েছে। সূত্র জানায়, এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে তিনি প্রতি মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ভাড়া তুলছেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত তহবিলে জমা হচ্ছে। এ ছাড়া গরুর হাটের পূর্ব পাশের ২৫ শতাংশের সরকারি পুকুরটির অর্ধেকের বেশি ভরাট করে তিনি নিজের একটি ব্যক্তিগত বৈঠকখানা, মিনি পার্ক ও কবুতরের খামার গড়ে তুলেছেন।
জানা গেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে হাট-বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের সরকারি টাকায় তিনি এসব ব্যক্তিগত স্থাপনা তৈরি করেছেন। ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গরুর হাটে মাটি ভরাট ও পুকুর পাড়ে গাইড ওয়াল নির্মাণের নামে তিনটি সরকারি প্রকল্পে মোট ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই টাকা দিয়েই চেয়ারম্যান মূলত তাঁর হোটেল, ব্যক্তিগত অফিস ও পার্কের কাজ করিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শরিক দল জাতীয় পার্টির নেতা হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে চেয়ারম্যান এসব জমি দখলে নেন। সে সময় কেউ বাধা দিতে গেলে চেয়ারম্যানের অনুসারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দিত। ফলে প্রশাসনও এতদিন নীরব ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা বলেন, বাজারের ড্রেনের পানি এই সরকারি পুকুরটিতে পড়ত। চেয়ারম্যান পুকুরটি ভরাট করে ফেলায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো হাটে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এই জলাবদ্ধতার কারণে এবার ঈদুল আজহায় কেউ গরুর হাটটি ইজারা নেয়নি। ফলে স্থানীয়দের দূরে গিয়ে কোরবানির পশু কিনতে হয়েছে।
উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মিরাজুল ইসলাম চেয়ারম্যানের দখলে ৪০ শতাংশ সরকারি জমি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সরকারি জমি ও পুকুর দখলের বিষয়টি স্বীকার করে ইউপি চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেন, ‘বাজারে আরও অনেক অবৈধ দখলদার রয়েছে। প্রশাসন তাদের আগে উচ্ছেদ করলে, আমিও সরকারি জায়গা ছেড়ে দেব।’ তবে সরকারি টাকায় ব্যক্তিগত অফিস বানানোর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, পুকুর পাড় ভেঙে পড়েছিল বলে প্রকল্পের টাকা দিয়ে তিনি গাইড ওয়াল করেছেন।
ইউএনও আরিফুর রহমান জানান, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি জমি ও পুকুর দখলের অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×