ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে যমুনা তীরবাসীর

ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে যমুনা তীরবাসীর
×

সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলার চর সেলিমাবাদে যমুনার ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত বিস্তীর্ণ এলাকা। ছবি- সমকাল

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ | ১৮:৫৯ | আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ | ১৯:০৭

যমুনা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জের সদর, কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ১০ থেকে ১৫ দিনের টানা ভাঙনে শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গাছপালা ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর আগ্রাসন অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী হাজারো মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নে ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। একসময় কয়েকশ পরিবার বসবাস করলেও ধারাবাহিক নদীভাঙনে জনপদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সাম্প্রতিক ভাঙনে আরও বহু পরিবার গৃহহীন হয়েছে। নদীতীরের ভাঙন যেভাবে অব্যাহত রয়েছে, তাতে আরও অসংখ্য পরিবারের বসতভিটা যেকোনো সময় নদীতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, বহু বছরের সঞ্চয়ে গড়ে তোলা ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে। শুধু বসতভিটাই নয়, পূর্বপুরুষের কবরস্থান, মসজিদ এবং বিভিন্ন সামাজিক স্থাপনাও নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর যমুনার ভাঙন চললেও কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকেই চিহ্নিত থাকলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভাঙন শুরু হলে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ভাঙন ঠেকাতে পারছে না। তাদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এ দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এদিকে, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ গত সপ্তাহে যমুনাগর্ভে বিলীন হয়েছে। সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগে বালু ভরে ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চালালেও স্থানীয়দের উদ্বেগ কাটছে না।

একই চিত্র দেখা গেছে চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চরসলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলেও। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলমান ভাঙনে গত দুই সপ্তাহে বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটসহ অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি শত শত বিঘা আবাদি জমিও নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে।

যমুনার পানি বাড়তে থাকায় সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি ও শাহজাদপুর উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতেও ভাঙনের আশঙ্কা বেড়েছে। নিচু এলাকার ফসলি জমি ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নৌকা ছাড়া চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। পানি আরও বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার বেড়েছে। তবে উভয় পয়েন্টেই পানি এখনও বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা এলাকায় নদীর ডান তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, যমুনায় পানি বৃদ্ধির কারণে সদর, শাহজাদপুর চৌহালী উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×