মোংলা বন্দরের পুকুরে মাছ চাষ
সুপেয় পানির সংকটে স্থানীয়রা
মোংলার কবরস্থান-সংলগ্ন পুকুর
মনিরুল হায়দার ইকবাল, মোংলা (বাগেরহাট)
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৮:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের শহর এলাকায় ইজারা দেওয়া পুকুরগুলোতে মাছ চাষের কারণে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। চাষের জন্য বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করায় পানি দূষিত হয়ে পড়েছে।
সুপেয় পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস এসব পুকুরে মাছ চাষের কারণে পানি ক্রমশ দূষিত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তি আর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন। পরিবেশবাদী সংগঠনসহ স্থানীয় ভুক্তভোগীরা সুপেয় পানির উৎস এসব পুকুর মাছ চাষের জন্য ইজারা প্রদান বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পুরাতন বন্দর এলাকার (মূল শহর) ছোট-বড় মিলিয়ে ৮টি পুকুর বিশেষ করে বিএলএস, কবরস্থান, রাতারাতি কলোনি ও আল প্রিন্স এলাকার ৪টি বড় পুকুর একসময় স্থানীয়দের জন্য বিশুদ্ধ পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল। এখন এগুলোর পানি মাছ চাষের কারণে দূষিত হয়ে পড়ছে। প্রতিবছর বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্পত্তি শাখা থেকে এসব পুকুর মাছ চাষের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পানিতে দেওয়া হচ্ছে সার ও নানা প্রকার পচনশীল খাবারসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও কেমিক্যাল মিশ্রিত ফিশ ফিড। এসব খাবারের ক্ষতিকর উপাদান মিশে পুকুরের পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করছে। পানি পচে দুর্গন্ধ হচ্ছে। এতে এলাকায় বসবাস করা দায় হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিকল্প কোনো নিরাপদ পানির উৎস না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে এই দূষিত পানি গোসল, রান্না, কাপড় ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করছেন। ভুক্তভোগী বিএলএস রোড-সংলগ্ন পুকুরপাড়ের বাসিন্দা মাছ ব্যবসায়ী কাজী আলম জানান, দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে এলাকায় পেটের পীড়া, ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই এলাকার বাসিন্দা শ্রমিক কালু মিয়া জানান, পুকুরের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। পানি পচে দুর্গন্ধ হয়। এতে মসজিদের মুসল্লি ও সাধারণ মানুষ এ পানি ব্যবহার করতে না পেরে বিপাকে পড়ছেন।
কবরস্থান-সংলগ্ন পুকুরপাড়ের বাসিন্দা হাসান মাহমুদ জানান, গরমকালে পুকুরের পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। উৎকট গন্ধে পরিবার-পরিজন নিয়ে পুকুরের আশপাশে বসবাস করা কষ্ট হয়ে যায়। এই এলাকার আরেক বাসিন্দা বেবী রহমান বলেন, পুকুরের পানি মুখে নিলেই বমি আসে। পানি পচে গন্ধ ছড়ায়।
রাতারাতি কলোনি-সংলগ্ন পুকুরপাড়ের বাসিন্দা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম শান্ত জানান, এ পুকুরপাড়ে বেশির ভাগ শ্রমিক পরিবার বসবাস করে। মাছ চাষের কারণে পুকুরের পানিতে দূষণ ঘটায় গরিব পরিবারগুলো বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে। গৃহস্থালি ও অন্যান্য নিত্যব্যবহার্য কাজে পুকুরের দূষিত পানি অনেকটা বাধ্য হয়েই ব্যবহার করতে হচ্ছে। স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর সুপেয় পানি কেনার টাকা নেই।
আল প্রিন্স-সংলগ্ন পুকুরপাড়ের বাসিন্দা চাকরিজীবী মনির হোসেন জানান, এ পুকুরের পানি এক সময় বিশুদ্ধ ছিল। এলাকার মানুষ পুকুরটির পানি পান করতেন। কিন্তু ক্রমাগত মাছ চাষের কারণে এর পানি নষ্ট হয়ে গেছে। এ বিষয়ে বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীন জানান, পুকুরের দূষিত পানি ব্যবহার করার ফলে মানুষ ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটে ব্যথাসহ নানা ধরনের পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া এ দূষিত পানির কারণে নানা চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। পরিবেশবাদী সংগঠন ওয়াটার্স কিপার্স বাংলাদেশের মোংলার সমন্বয়কারী ও কেন্দ্রীয় সদস্য শেখ মো. নূর আলম বলেন, সুপেয় পানির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত পুকুরগুলোতে মাছ চাষের অনুমতি দেওয়া সম্পূর্ণ অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। তিনি অবিলম্বে ইজারা প্রথা বাতিল করে সুপেয় পানির উৎস ধরে রাখতে পুকুরগুলোকে পৌরসভার কাছে হস্তান্তরের দাবি জানান।
মোংলা পোর্ট পৌরসভা সুপেয় পানি সংরক্ষণ করে তা পৌরবাসীর মাঝে সরবরাহের জন্য পুকুরগুলো তাদের অনুকুলে বরাদ্দের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছে। মোংলা পোর্ট পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমী জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে মাছ চাষের ইজারা দেওয়ার পরিবর্তে পৌর এলাকায় সুপেয় পানির সংকট রোধে পুকুরগুলো পৌরসভাকে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
গত ২ মে মোংলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে স্থানীয় এমপি এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের উপস্থিতিতে এক নাগরিক সংলাপে সুপেয় পানির উৎস ধরে রাখতে জেলা পরিষদ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা পুকুরগুলোর ইজারা প্রথা বাতিলসহ এগুলো সংস্কারের দাবি জানানো হয়। এ দাবির সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী একাত্মতা ঘোষণা করে সুপেয় পানির পুকুরগুলোর ইজারা প্রথা বাতিলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের উপব্যবস্থাপক মো. মাকরুজ্জামান এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, পৌরসভার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুকুরগুলোকে তাদের অনুকূলে বরাদ্দ প্রদানের জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি কার্যক্রম শুরু করেছে। তাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- পুকুর
