অসুস্থ অর্ধশতাধিক শ্রমিক
‘মেশিনের ভেতর থেকে গন্ধ আসে, তারপর মাথা ঘুরে পড়ে যাই’
আশুলিয়ায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন শ্রমিকেরা। ছবি: সমকাল
নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ২২:০৯ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ | ২২:২৭
সাভারের আশুলিয়ায় ৬টি তৈরি পোশাক কারখানার অর্ধশতাধিক শ্রমিক অজানা রোগে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সকালে এসব শ্রমিকেরা শ্বাসকষ্ট ও মাথাব্যথার সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান। তবে কী কারণে তার অসুস্থ হয়ে পড়েছে তা প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি। এ ঘটনায় কারখানার শ্রমিকদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পরিস্থিতি সামলাতে লুসাকা গার্মেন্টস এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এদিকে শ্রমিকরা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় তদন্ত করছে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
কারখানা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার সকালে আশুলিয়ার লুসাকা গার্মেন্টস, অরুনিমা স্পোর্টস ওয়্যার লিমিটেড, অ্যালায়েন্স নিট লিমিটেড, মিলেনিয়াম টেক্সটাইল লিমিটেড, ম্যাগপাই কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড ও চায়না মালিকানাধীন জিনতাই টু অ্যাপারেল গার্মেন্টসের অর্ধশতাধিক শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের বেশিরভাগই মাথা ঘোরা, বমি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা যায়। এ সময় অসুস্থ শ্রমিকদের উদ্ধার করে প্রথমে কারখানার মেডিকেল সেন্টার ও পরে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে লুসাকা গার্মেন্টসের সকল ইউনিটে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
ম্যাগপাই কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানার শ্রমিক ও কর্মকর্তারা জানায়, প্রতিদিনের মতো সকালে হাজারো শ্রমিক কারখানায় কাজে যোগ দেয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ ২৫-৩০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ে।

কারখানাটির শ্রমিক কল্পনা আক্তার বলেন, সকালে কারখানায় কাজে যোগ দেয়ার পর হঠাৎ মেশিনের ভেতর থেকে একটা গন্ধ আসে। এরপর আমাদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে এবং হাত-পা অবশ হয়ে আসে। এ সময় বমি বমি ভাব হলে মাথা ঘুরে পড়ে যাই।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অপারেটর সেলিনা আক্তার বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ মাথা ঘুরতে শুরু করে। এরপর বমি বমি ভাব হয় এবং একপর্যায়ে বমি করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখি হাসপাতালে আছি।
আরেক শ্রমিক রূপালি বেগম জানান, প্রথমে মাথা ঘোরায়, পরে বমি বমি ভাব শুরু হয়। অসুস্থ বোধ করায় তিনি কারখানার মেডিকেল সেন্টারে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন, তার মতো আরও অনেক শ্রমিক চিকিৎসা নিচ্ছেন।
কারখানার ফায়ার সেফটি অফিসার নাহিদ বলেন, সকাল ১০টা থেকে ১১টার দিকে হঠাৎ ফ্লোর থেকে একের পর এক কর্মী আমাদের মেডিকেল সেন্টারে আসতে শুরু করেন। আমরা তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিই। যাদের সমস্যা বেশি ছিল, তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ডাক্তাররা চিকিৎসা দিচ্ছেন। এখন তারা মোটামুটি সবাই সুস্থ আছেন, ভালো আছেন।
নাহিদ হাসান আরও বলেন, সোমবারও দুপুরের খাবারের পর ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে শ্রমিকদের মাথা ঘুরতে শুরু করে। পরে বমি বমি ভাব এবং কয়েকজনের ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, কোরবানির ঈদের আগ থেকেই আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে অতিরিক্ত গরম, কারখানার ভেতরে অক্সিজেনের স্বল্পতা, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের অভাব এবং রক্তশূন্যতার মতো কারণ এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সাইদুল ইসলাম বলেন, কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। মঙ্গলবার অন্তত ছয়টি কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে। এসব কারখানাতেও বিভিন্ন সময়ে শ্রমিকদের একই ধরনের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে কিছু বলা সম্ভব নয়।
সাভার ল্যাবজোন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আবদুল আহাদ বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে লুসাকা গার্মেন্টস থেকে একসঙ্গে অনেক রোগী আমাদের এখানে এসেছেন। তাদের প্রধান সমস্যা ছিল শ্বাসকষ্ট। এর সঙ্গে কয়েকজনের বমি এবং কারও কারও মাথা ঘোরার উপসর্গ ছিল। আমরা প্রাথমিকভাবে যতটুকু সম্ভব চিকিৎসা দিয়েছি। যাদের অবস্থা তুলনামূলক বেশি খারাপ ছিল, তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। এখন বেশিরভাগ রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল।
শিল্প পুলিশ (১) এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, গত তিন চারদিনে আশুলিয়ায় অন্তত ৬টি কারখানার শ্রমিকরা একই ধরনের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সুস্থ হওয়ার পর তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তবে সুনির্দিষ্ট কারণ কেউ বলতে পারেনি। কারখানার শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি- এটি ম্যাস হিস্টিরিয়া বা ম্যাস সাইকোজেনিক ডিজিজ।
