ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

জেগে ওঠা চর, ভাঙন, নাব্য সংকট নানামুখী প্রভাব

জেগে ওঠা চর, ভাঙন, নাব্য  সংকট নানামুখী প্রভাব
×

পদ্মা সেতুর নিচে জেগে ওঠা চর। সম্প্রতি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবার চর এলাকায় সমকাল

শরীয়তপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

একদিকে পলি জমে জেগে উঠছে বিস্তীর্ণ চর, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে নদীর মূল প্রবাহ। ফলে নদী হারাচ্ছে নাব্য, বাড়ছে ভাঙন, ব্যাহত হচ্ছে নৌযান চলাচল, কমছে ইলিশসহ দেশীয় মাছের উৎপাদন। শরীয়তপুরের পদ্মা নদীর মাঝিরঘাট থেকে সুরেশ্বর পর্যন্ত প্রায় পুরো নদীপথেই এখন এমন চিত্র। নদীর বুকে ক্রমাগত পলি জমে সৃষ্টি হওয়া এসব চরের কারণে শুধু নদীর স্বাভাবিক গতিপথই পরিবর্তিত হচ্ছে না, এর প্রভাব পড়ছে নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবিকায়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড  (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে উজানের বিপুল পরিমাণ পলি পদ্মা নদীতে আসতে শুরু করে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকা দিয়ে বছরে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন টন পলি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে, এই পলি দ্রুত নদীর তলদেশে জমে বড় বড় চর সৃষ্টি করে। ফলে নদীর গভীরতা কমে যায় এবং নাব্য সংকট প্রকট হয়ে ওঠে। এর ওপর আবার বছরের পর বছর ধরে নদীর এ অংশে পরিকল্পিত ড্রেজিং না হওয়ায় সমস্যা দিন দিন জটিল হচ্ছে। এ অবস্থায় পাউবো মাঝিরঘাট পদ্মা সেতুর জিরো পয়েন্ট থেকে সুরেশ্বর ঘাট পর্যন্ত প্রায় ২৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদীপথে একটি হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ সম্পন্ন করেছে। এছাড়া সুরেশ্বর থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার নদীপথে পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের জন্য একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রক্রিয়াধীন। 

এক সময় যে পদ্মা নদী ছিল প্রবল স্রোত আর গভীর পানির জন্য পরিচিত, এখন সেই নদীর অনেক স্থানে বিস্তীর্ণ বালুচর দেখা যায়। কোথাও কোথাও নদীর মূল চ্যানেল এতটাই সরু হয়ে গেছে যে মাঝারি আকারের ট্রলারও চলাচলে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় পানি ধারণক্ষমতাও কমছে। নদীর মধ্যে বড় বড় চর সৃষ্টি হলে মূল স্রোত বাধাপ্রাপ্ত হয়ে নতুন দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে যে এলাকায় আগে ভাঙন ছিল না, সেখানেও শুরু হয় তীব্র ভাঙন। নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় যাত্রীবাহী ট্রলার, বাল্কহেড ও মালবাহী নৌযান চলাচলে প্রতিনিয়ত সমস্যা হচ্ছে। 

ইলিশসহ মাছের উৎপাদন ব্যাহত
এদিকে পদ্মা নদী বাংলাদেশের অন্যতম ইলিশের বিচরণ ও অভিবাসন পথ। নদীর গভীরতা কমে গেলে ইলিশের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। ডিম ছাড়ার উপযোগী পরিবেশও নষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয় জেলে ও মৎস্য-সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ইলিশ নয়, বোয়াল, বাঘাইর, পাঙাশসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছও নদীর গভীর পানির ওপর নির্ভরশীল। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় এসব মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। 

জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পদ্মা ও মেঘনা নদীবেষ্টিত জেলা শরীয়তপুর। ওই দুটি নদীর ৭১ কিলোমিটার অংশ রয়েছে শরীয়তপুরে। নড়িয়া উপজেলার ৫ কিলোমিটার ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার ১৫ কিলোমিটার মোট ২০ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে মৎস্য বিভাগ। মাঝিরঘাট এলাকার জেলে হাকিম মাঝি প্রায় ৩০ বছর ধরে পদ্মা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিনি বলেন, ‘এক সময় নদীতে কয়েক ঘণ্টা জাল ফেললেই ভালো পরিমাণ বড় সাইজের ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে থেকেও আগের অর্ধেক মাছও জোটে না। নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় আমাদের আয়ও অনেক কমে গেছে। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে অনেক সময় দিনমজুরি বা ভ্যান চালানোর মতো কাজ করতে হয়। প্রায় দশ বছর আগেও যে আকারের ইলিশ নিয়মিত ধরতাম, এখন সেই সাইজের ইলিশ খুব একটা চোখে পড়ে না।’ 
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, নদীর নাব্য কমে যাওয়া এবং পলি জমে চর সৃষ্টি হওয়াই বর্তমানে ইলিশের উৎপাদন ও বিচরণ কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। শরীয়তপুরে পদ্মা নদীর প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। এটি ইলিশের প্রজনন ও বিচরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। বছরের পর বছর নদীতে পলি জমে বড় বড় চর জেগে ওঠায় নদীর গভীরতা ও প্রবাহ কমে যাচ্ছে। ফলে ইলিশ আগের মতো সহজে এ এলাকায় প্রবেশ ও বিচরণ করতে পারছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইলিশ উৎপাদনে। ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও উৎপাদন বাড়াতে নদীর নাব্য রক্ষা এবং পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং করে চর অপসারণ জরুরি।

আরও পড়ুন

×