ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

১০ হাজার টাকায় বিদেশে!

১০ হাজার টাকায় বিদেশে!
×

ফাইল ছবি

লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০৭ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্র ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় বিদেশে ভালো চাকরি, মোটা বেতনের। সেই স্বপ্নের শেষ গন্তব্য ভারতের কারাগার। দীর্ঘ ১৭ মাস বন্দিজীবন কাটিয়ে দেশে ফেরা বগুড়ার যুবকের বর্ণনায় উঠে এসেছে সীমান্তজুড়ে সক্রিয় মানব পাচার চক্র এবং বিদেশের মাটিতে বন্দিদশার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। এই চক্র বিভিন্ন দেশে মানব পাচারেও জড়িত।

গত ২৯ মে ভারতের পেট্রাপোল (বেনাপোল) চেকপোস্ট দিয়ে ৩৬ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠায় দেশটির কর্তৃপক্ষ। তাদের মধ্যে ২৬ জনই বগুড়ার বাসিন্দা। অধিকাংশের বাড়ি নন্দীগ্রাম উপজেলার কহুলী, কাথম, ভাটগ্রাম, টেকরি, সিংড়াপাড়া ও দোহার গ্রামে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তারা কারাগার ও ডিটেনশন ক্যাম্পে কাটিয়েছেন ১৭ মাস। 

ফিরে আসা যুবকদের মধ্যে রয়েছেন নন্দীগ্রাম উপজেলার কহুলী গ্রামের আব্দুল মোমিন, রানা আহমেদ ও আতিকুল ইসলাম। আব্দুল মোমিন ২০১৮ সালে ১০ হাজার টাকা দিয়ে বেনাপোল হয়ে ভারতে যান। ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি চেন্নাইয়ে পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার হন। একই গ্রামের রানা আহমেদ ২০২২ সালে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। তিনিও একই দিনে চেন্নাইয়ে গ্রেপ্তার হন। অন্যদিকে আতিকুল ইসলাম ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভুটানে চাকরির প্রলোভনে প্রায় ২৪ হাজার টাকা দিয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট হয়ে ভারতে যান ও গ্রেপ্তার হন। 

অবৈধ পথে ভারতে
ফিরে আসা যুবকদের ভাষ্য, মানব পাচার মামলার নথি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুসারে বেনাপোল, হিলি ও হালুয়াঘাট সীমান্তকে কেন্দ্র করে অনেক স্তরবিশিষ্ট একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয়। এই নেটওয়ার্কে স্থানীয় দালাল, সীমান্ত সমন্বয়কারী, নিরাপদ আশ্রয়দাতা, পরিবহন সহযোগী এবং ভারতীয় রিসিভাররা যুক্ত থাকে। রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকায় এই পারাপারের কাজ চলে। কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করলে তাদের বুঝে নেয় ভারতীয় এজেন্ট। 

তাদের বর্ণনা অনুসারে বিষয়টি জানতে অনুসন্ধান করে সমকাল। জানা যায়, হালুয়াঘাট সীমান্তের কড়ইতলী ও গাবরাখালী এলাকা ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পারাপার পরিচালনা করছে। সেখানে ফিলিপ পাল এ চক্রের প্রধান হোতা। হিলি সীমান্তে কুশ বর্মণ, মিজানুর রহমান ও গৌতম মণ্ডলের নাম রয়েছে পুলিশের খাতায়। অন্যদিকে বেনাপোল সীমান্তের পুটখালী, গাতিপাড়া ও দৌলতপুর রুট ঘিরে অন্তত এক ডজন ছোট-বড় দালাল চক্র সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।


জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার এবং রাইটস যশোরের মতো স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ও ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্যমতে, বেনাপোল সীমান্তে ১২টি ছোট-বড় দালাল চক্র বা লাইনম্যান সক্রিয়। এরা মূলত নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা এবং যশোর অঞ্চলকে টার্গেট করে। স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী আবেদ হোসেন বলেন, এসব চক্র প্রথমে গ্রামের বেকার যুবকদের প্রলুব্ধ করে। বিদেশে কম খরচে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের রাজি করানো হয়। 

হিলি সীমান্তের পাচার চক্রের সদস্য জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার চেঁচড়া গ্রামের মিজানুর রহমান ও ভুইডোবারের গৌতম মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তারা কথা বলতে রাজি হয়নি। তবে মিজানুরের হয়ে মাঠে কাজ করা পাঁচবিবি সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, এখন পরিস্থিতি কড়াকড়ি। তবে কাজ হচ্ছে। টাকা একটু বেশি লাগছে। আমরা পার করে দিই; বাকিটা ওপারের দায়িত্ব।

ভালো চাকরির লোভ
নন্দীগ্রাম উপজেলার কয়েকটি গ্রাম থেকে বিগত ৫ বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুবক অবৈধভাবে ভারতে গেছেন। উপজেলার কহুলী গ্রামের আব্দুল মোমিন বলেন, সংসারের অভাব ঘোচানোর জন্য ভারতে গিয়েছিলাম। একদিন হঠাৎ পুলিশ অভিযান চালিয়ে ধরে নিয়ে যায়। তারপর শুরু হয় জেলজীবন।

একই গ্রামের রানা আহমেদ বলেন, ভালো বেতনের চাকরির আশায় গিয়েছিলাম। ১৪ মাস জেলে ছিলাম। পরে আরও তিন মাস ক্যাম্পে থাকতে হয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী আতিকুল ইসলাম জানান, তাঁকে ভুটানে চাকরির কথা বলা হয়েছিল। পরে তাঁকে চেন্নাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তারের পর চেন্নাই সেন্ট্রাল জেলে মামলার শুনানি শেষ হতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগে। পরে আদালত তাদের সাজা দেন। কারাভোগের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ডিটেনশন ক্যাম্পেও থাকতে হয়েছে। 
রানা আহমেদ বলেন, বাংলাদেশিদের সঙ্গে বৈষম্য করা হতো। 

যা বলছে প্রশাসন
অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচার রোধে বগুড়া জেলা প্রশাসন মাঠ পর্যায়ে নজরদারি ও সচেতনমূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা নিয়মিত সচেতনমূলক সভা, প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা চালাচ্ছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়। চলতি বছরের ৪ এপ্রিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের কাছে পৃথক ডিও পাঠান বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন। পরবর্তী সময়ে সরকারের উদ্যোগে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। এ বিষয়ে মোশারফ হোসেন বলেন, সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও কূটনৈতিক সফলতার কারণেই তারা দেশে ফিরতে পেরেছেন।

আরও পড়ুন

×