চোখের সামনেই নদীতে ভিটেমাটি
ভাঙনে ভিটার দোরগোড়ায় নদী। আতঙ্কে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়ার উজান বোচাগাড়ি এলাকার বাসিন্দারা সমকাল
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘চোখের সামনেই পলকের মধ্যে চলি গেল বাপ-দাদার বসতভিটা। মুই কিছুই করবার পানু না। খালি চাইয়া চাইয়া দেখনু। সারারাত জাগি ঘরের মালপত্র আর চালের টিন খুলে রাখছি। না হলে ঘরসহ নদীত চলি যাইত। সিমেন্টের খুঁটিগুলাও সরানোর লোক পাইলাম না। এখন আর কেউ আসে না। ভোট আইলে কত কথা কয়। হ্যামরা কারও দোষ দেই না, সবই হ্যামার কপালের দোষ।’
কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চরের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী মো. ফরমান আলী। গত ২৯ জুন (সোমবার) চোখের সামনে তিস্তার ভয়াল ভাঙনে বাপ-দাদার শেষ স্মৃতিচিহ্ন বসতভিটা নদীতে বিলীন হতে দেখেছেন তিনি। এর আগেও পাঁচবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। এবার হারিয়েছেন পূর্বপুরুষের শেষ আশ্রয়টুকুও।
টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের মুখে পড়ে বসতঘর সরিয়ে নিতে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন চরবাসী। একই সঙ্গে নদীর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ভাঙনকবলিত এলাকায় মানবেতর জীবনযাপন করলেও এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো দপ্তরের কার্যকর উপস্থিতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের উজান বোচাগাড়ি, ভোরের পাখি চরসহ আশপাশের এলাকায় দুই শতাধিক বসতভিটা, পাঁচ শতাধিক একর ফসলি জমি এবং বিভিন্ন সড়ক নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও হাজারো বসতঘর, শত শত একর আবাদি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাপাসিয়া, হরিপুর, বেলকা, চণ্ডীপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরাঞ্চল। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। আগে কিছু এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হলেও বর্তমানে সেটিও বন্ধ।
কাপাসিয়া ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, ভাঙনের মুখ থেকে ঘরবাড়ি সরাতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চরবাসী। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে আসেননি। তিনি স্থায়ী নদীশাসনের দাবি জানান।
কাপাসিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া বলেন, এক সপ্তাহ ধরে লালচামার, ফুলমিয়ার মোড়, উজান বোচাগাড়ি ও ভাটি বোচাগাড়ি এলাকায় ব্যাপক ভাঙন চলছে। নিমেষেই নদীতে চলে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও সড়ক। সরকারি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনও চোখে পড়েনি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মোজাহারুল ইসলাম বলেন, নদী খনন, ড্রেজিং, সংরক্ষণ ও স্থায়ী নদীশাসন ছাড়া তিস্তার ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। জিও টিউব বা জিও ব্যাগ দিয়ে সাময়িক সমাধান হলেও স্থায়ী সুরক্ষা মিলছে না। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সুন্দরগঞ্জের মানচিত্রই বদলে যেতে পারে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মশিয়ার রহমান বলেন, কাপাসিয়া ও হরিপুর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ত্রাণ বিতরণ করা হবে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, কোথাও ভাঙন দেখা দিলে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলার পাশাপাশি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে খনন, ড্রেজিং ও নদীশাসন ছাড়া ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়।
এদিকে টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে তিস্তার চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এক চর থেকে হাট-বাজার ও উপজেলা সদরে যেতে এখন নৌকাই একমাত্র ভরসা। পরিবারগুলো দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
- বিষয় :
- নদী