ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

‘জমি গেছে, এবার বাড়িটাও গেলে থাকমু কোথায়’

যমুনার ভাঙনে দিশেহারা নদীপারের মানুষ

‘জমি গেছে, এবার বাড়িটাও গেলে থাকমু কোথায়’
×

অশ্রুসিক্ত নয়নে উত্তাল যমুনার দিকে তাকিয়ে বগুড়ার ধুনট উপজেলার শিমুলবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা জরিনা খাতুন। ছবি: সমকাল

গিয়াস উদ্দিন টিক্কা, ধুনট (বগুড়া)

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৪৮

‘আগে জমি গেল, এখন নদী বাড়ির দিকেই আসতেছে। আর কত দূর? বাড়িটাও যদি যায়, তাহলে থাকমু কোথায়?’ কথাগুলো বলতে বলতে যমুনার দিকে তাকিয়ে থাকেন বগুড়ার ধুনট উপজেলার শিমুলবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা জরিনা খাতুন। কয়েক বছর আগেও বাড়ির সামনে ছিল ফসলি জমি। সেই জমিতেই সারা বছরের খাদ্যের জোগান হতো। এখন সেই জমির জায়গায় শুধু উত্তাল যমুনার স্রোত। নদী প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে আসছে তার বসতভিটার দিকে।

ধুনটের ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়নের শহরাবাড়ি থেকে বানিয়াযান পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখন একই আতঙ্ক। টানা বর্ষণ আর উজানের পানিতে যমুনার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র হয়েছে নদীভাঙন। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে নতুন নতুন অংশ। নদীপারের অন্তত ১২ গ্রামের মানুষের দিন কাটছে ঘর হারানোর শঙ্কায়।

স্থানীয়রা জানায়, গত বছরের অক্টোবর মাসে শহরাবাড়ি নৌঘাট এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নদীতে বিলীন হয়ে যায় ঘাট এলাকার নয়টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও প্রায় ৪৩০ মিটার এলাকা। তখন জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন সাময়িকভাবে ঠেকানো হয়েছিল। কিন্তু চলতি বর্ষায় সেই ব্যবস্থা আর কাজে আসছে না।

শিমুলবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য জহুরুল ইসলাম নান্নু মণ্ডল বলেন, গত দুই বছর ধরে একটি প্রভাবশালী মহল যমুনা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। বিষয়টি নিয়ে মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। তার দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ভাঙন আরও ভয়াবহ হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি থেকে নদী এখন মাত্র দুই শ গজ দূরে। এভাবে চলতে থাকলে শুধু আমার বাড়ি নয়, পুরো শিমুলবাড়ি গ্রামই নদীতে চলে যেতে পারে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, যমুনার সঙ্গে তাদের লড়াই নতুন নয়। প্রতিবছর বর্ষা এলেই ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটে। গত চার দশকে ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়নের বৈশাখী, রাঁধানগর, বথুয়ারভিটা, নিউ সারিয়াকান্দি, আটারচর, পুকুরিয়া, ভূতবাড়ি ও কৈয়াগাড়িসহ কয়েকটি গ্রাম মানচিত্র থেকেই হারিয়ে গেছে। হাজারো পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কিংবা অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে বর্তমানে বালুভর্তি বস্তা ও জিও টিউব ফেলা হলেও তীব্র স্রোতের কাছে তা টিকছে না। প্রতিদিনই নতুন নতুন স্থানে ধস নামছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজিপুর উপজেলার ঢেকুরিয়া থেকে ধুনটের বানিয়াযান স্পার পর্যন্ত যমুনার ডান তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এতে প্রায় এক দশক ভাঙন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে সারিয়াকান্দির কামালপুর থেকে ধুনটের শহরাবাড়ি স্পার পর্যন্ত অংশে স্থায়ী তীর সংরক্ষণকাজ না হওয়ায় এখন ওই এলাকা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

সম্প্রতি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। তিনি বলেন, আপাতত জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি বস্তা ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে। স্থায়ী তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়েছে এবং আগামী শুকনো মৌসুমে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, সারিয়াকান্দির কামালপুর থেকে ধুনটের শহরাবাড়ি স্পারের উজান এবং শহরাবাড়ি থেকে বানিয়াযান স্পার পর্যন্ত অংশ এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও টিউব ও বালুভর্তি বস্তা ফেলা হচ্ছে। তার মতে, শহরাবাড়ি স্পারের সামনে জমে থাকা বালুচর ড্রেজিং করা গেলে ভাঙনের ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।

আরও পড়ুন

×