ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

প্রযুক্তি শিক্ষা আলমারিবন্দি কোটি টাকার ল্যাবে তালা

প্রযুক্তি শিক্ষা আলমারিবন্দি  কোটি টাকার ল্যাবে তালা
×

চারঘাটের নন্দনগাছী উচ্চ বিদ্যালয়ের ডিজিটাল ল্যাবটি আর ব্যবহার হচ্ছে না সমকাল

 চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

দরজায় ঝুলছে তালা। জানালার কাচে ধুলোর আস্তরণ। ভেতরে সারি সারি টেবিল-চেয়ার, কোনায় স্তূপ করে রাখা বিকল ল্যাপটপ। যে কক্ষে শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার শেখার কথা, সেখানে চলছে বাংলা ও গণিতের ক্লাস। কোথাও আবার সরকারি ল্যাপটপ বিদ্যালয়ে নয়, রয়েছে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত হেফাজতে– এমন অভিযোগও মিলেছে।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় সরকারি অর্থায়নে স্থাপিত ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাবগুলোর বাস্তব চিত্র এখন এমনই।
উপজেলার ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও চারটি কলেজ ঘুরে দেখা গেছে, কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত অধিকাংশ আইসিটিডি ডিজিটাল ল্যাব কার্যত অচল। অধিকাংশ ল্যাপটপ বিকল, ল্যাব সহকারী নেই, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ নেই। কোথাও শ্রেণিকক্ষের সংকটে ল্যাবেই চলছে সাধারণ পাঠদান। অথচ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা। বাস্তবে কোটি টাকার সরঞ্জাম ব্যবহার না হয়ে ধুলো জমছে আলমারিতে।

নন্দনগাছী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ২০২১ সালে স্থাপিত ল্যাবের ১৭টি ল্যাপটপের ১৩টিই নষ্ট। ভেঙে গেছে চেয়ার। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ল্যাব। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম জানায়, আইসিটি শুধু বইয়ে পড়ে, কম্পিউটারে হাত দেওয়ার সুযোগ হয় না।
প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান আখন্দ বলেন, ‘একটি ল্যাপটপের সরকারি মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু নিম্নমানের ল্যাপটপ দেওয়ায় অল্প সময়েই অধিকাংশ বিকল হয়ে গেছে। কয়েকবার তালিকা পাঠিয়েছি, কিন্তু মেরামত হয়নি।’
একই অবস্থা রায়পুর উচ্চ বিদ্যালয়েও। এ প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ১৭টির মধ্যে ১৫টি ল্যাপটপ নষ্ট। দুটি প্রজেক্টর, প্রিন্টারও অকেজো। প্রধান শিক্ষক সাজদার আলী বলেন, ‘ল্যাব সহকারী না থাকায় কেউ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করেনি। এখন শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ে কম্পিউটার শেখে।’
একাধিক শিক্ষক জানান, সফটওয়্যার আপডেট, ভাইরাস প্রতিরোধ, হার্ডওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় ধীরে ধীরে সব যন্ত্রপাতিই অচল হয়ে যাচ্ছে।
রাওথা কলেজে গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে দুই বছরের বেশি সময় ধরে ডিজিটাল ল্যাবটি সাধারণ শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সব ল্যাপটপ, স্ক্যানার, প্রিন্টার আলমারিতে তুলে রাখা হয়েছে।

অধ্যক্ষ নাদের আলী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ক্লাসও তো বন্ধ রাখা যায় না। তাই আপাতত ল্যাব ব্যবহার করতে পারছি না।’
বনকিশোর উচ্চ বিদ্যালয় ও সরদহ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছে, সচল সরকারি ল্যাপটপ বিদ্যালয়ে না রেখে শিক্ষকদের বাড়িতে রাখা হয়েছে। সরেজমিন ল্যাবে গিয়ে কয়েকটি ল্যাপটপ পাওয়া যায়নি।
যদিও বনকিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর হোসেন দাবি করেন, ‘ল্যাপটপ ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়নি। মেরামতের জন্য বাইরে পাঠানো হয়েছে।’
উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার রাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছিল, ভবিষ্যতে যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে নিজেদের অর্থে মেরামত করবে। এখন সেই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।’
উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ল্যাব সহকারী নিয়োগের সুযোগ তৈরির জন্য ল্যাব নিয়েছে। পরে রক্ষণাবেক্ষণ করেনি। কোথাও নিয়োগ বাণিজ্য, কোথাও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব– সব মিলিয়ে প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়েছে।’
উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা মাহফুজ আরিফিন জানান, ১৮টি ল্যাব পরিদর্শন করে নষ্ট যন্ত্রপাতির তালিকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×