ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

‘মনে করেছিলাম আমি ও আমার সন্তান আর বাঁচব না’

‘মনে করেছিলাম আমি ও আমার সন্তান আর বাঁচব না’
×

প্রসববেদনা ওঠায় পানিবন্দী এক নারীকে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নিচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ছবি- সমকাল

লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ১৬:৪৫

‘রাতে হঠাৎ প্রসববেদনা ওঠে। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। বাড়ির সামনের পুরো রাস্তা গলাসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল, আমি আর আমার সন্তান—কেউই আর বাঁচব না। বারবার আল্লাহকে ডাকছিলাম।’—কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকার গৃহবধূ মিজবাহুল জান্নাত (২২)।

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চারদিকে পানি আর পানি। গভীর রাতে প্রসববেদনা উঠলেও প্রতিবেশীদের ডেকে কোনো সাড়া পাননি পরিবারের সদস্যরা। প্রবল বর্ষণের শব্দে কারও কানে তাদের ডাক পৌঁছায়নি। শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়। পরে উদ্ধারকর্মীরা কোমর থেকে গলাসমান পানি পেরিয়ে স্ট্রেচারে করে ওই গৃহবধূকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তিনি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।

বৃহস্পতিবার সকাল ৬টার দিকে উপজেলার পশ্চিম আমিরাবাদ ইউনিয়নের খৈয়ারকুল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মিজবাহুল জান্নাত সৌদি আরবপ্রবাসী রিয়াজ উদ্দিনের স্ত্রী। ডলু নদের তীরবর্তী খৈয়ারকুল গ্রামটি কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে।

মিজবাহুল জান্নাত বলেন, ‘রাতে প্রসববেদনা ওঠার পর খুব ভয় পেয়েছিলাম। বারবার আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। মনে হচ্ছিল আমি ও আমার সন্তান আর বাঁচব না। আল্লাহর রহমতে ফায়ার সার্ভিস এসে আমাকে উদ্ধার করেছে।’

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দিবাগত রাত ২টার দিকে তার প্রসববেদনা শুরু হয়। বাড়ি থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার হলেও বন্যার পানিতে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর ভোরে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলে উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে নিরাপদে হাসপাতালে নিয়ে যান।

লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা রাখাল চন্দ্র রুদ্র বলেন, ‘খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। প্রায় দেড় ঘণ্টার অভিযানে ওই নারীকে উদ্ধার করা হয়। স্টেশন থেকে তার শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব প্রায় ৬০০ মিটার হলেও পুরো পথ পানির নিচে ছিল। স্ট্রেচারে কাঁধে বহন করে আগে থেকে প্রস্তুত রাখা অ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে পাঠানো হয়।’

এদিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে লোহাগাড়ার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ডলু, হাঙ্গর ও টঙ্কাবতী নদীর পানি বেড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বুধবার রাত থেকেই উপজেলার সব ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলা সদর, ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়কের অধিকাংশই ডুবে থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে অন্তত অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চট্টগ্রাম উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার বলেন, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×