ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টি-জোয়ারে হাতিয়ার দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি

তলিয়ে গেছে ৩০০ হেক্টর আমনের বীজতলা, ঝুঁকিতে ২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ

টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টি-জোয়ারে হাতিয়ার দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি
×

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমির আমনের বীজতলা। ছবি: সমকাল

নোয়াখালী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ১৯:১৬ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬ | ১৯:১৭

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টি ও জোয়ারে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার পৌরসভাসহ ১১টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমির আমনের বীজতলা। একই সঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়েছে ২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ।

উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, গত রোববার থেকে নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানিতে উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দুর্গত মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের দলগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণ বিতরণ করছে।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল থাকায় গত রোববার সকাল থেকে হাতিয়ার সঙ্গে সারা দেশের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে হাতিয়াসহ বিভিন্ন ঘাটে হাজারো যাত্রী আটকা পড়েছেন।

হাতিয়া প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের পর্যবেক্ষক মো. বাবলুর রহমান বলেন, নিম্নচাপের প্রভাবে গত রোববার রাত থেকে হাতিয়ার ওপর দিয়ে ভারী বৃষ্টিপাত ও দমকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। শুক্রবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে বুধবার ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল।

জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, জেলা শহরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবদুল বাছেত বলেন, ভারী বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমির আমনের বীজতলা তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী জামিল আহমেদ পাটোয়ারী বলেন, হাতিয়ায় ১০৯ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ২৪ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে প্রায় ১৩ কিলোমিটার অংশ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের কাজ চলছে।

বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা জানান, নলচিরা, চর ঈশ্বর, চর কিং, বুড়ির চর ও নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধ উপচে বা ভেঙে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

চর ঈশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন আজাদ বলেন, বাংলা বাজার ও আফাজিয়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি ঢুকে কয়েক শ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকের আমনের বীজতলাও নষ্ট হয়েছে।

নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, টানা বৃষ্টি ও জোয়ারে দ্বীপের অধিকাংশ সড়ক তলিয়ে গেছে। জাতীয় উদ্যান এলাকার কিছু হরিণও পানিতে ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বুড়ির চর ইউনিয়নের কালীর চর গ্রামের বাসিন্দা নিজাম চৌধুরী বলেন, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর এত দীর্ঘ সময় ধরে এত পানি তিনি আর দেখেননি। প্রধান সড়ক ছাড়া প্রায় সব সড়কই পানির নিচে। খাদ্যসংকটে অনেক পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে।

এদিকে বৃষ্টির মধ্যে মাছ ধরতে গিয়ে নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বন্দরটিলা এলাকার বাসিন্দা মো. মিলন পানিতে ডুবে মারা গেছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। যেসব পরিবার এখনো ত্রাণ পায়নি, তারা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×