বাঁশখালীতে পানির স্রোতে ভেসে দুই শিশুর মৃত্যু, বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি
ছবি: ফোকাস বাংলা
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৪৯
বাড়ি ফিরছিল ১১ বছরের আশিক। চারদিকে তখন থইথই পানি। হঠাৎ প্রবল স্রোতে পড়ে যায় সে। স্থানীয় লোকজন দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসকের কাছে নিলেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। একই সময়ে একই ইউনিয়নে খেলতে গিয়ে স্রোতের পানিতে তলিয়ে যায় পাঁচ বছরের মিরাজও। দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় শোক নেমে এসেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে।
বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক দুই শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার আজিম বলেন, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার পর বাড়ি ফিরছিল আশিক। পথে পানির প্রবল স্রোতে পড়ে যায় সে। স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
একই ইউনিয়নের বাসিন্দা দিদারুল আলম বলেন, অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছিল মিরাজ। হঠাৎ স্রোতের পানিতে পড়ে যায়। দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এদিকে চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টির তীব্রতা শুক্রবার কিছুটা কমলেও জেলার গ্রামীণ জনপদে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও বুকসমান পানিতে তলিয়ে আছে ঘরবাড়ি। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি মানুষ খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটে পড়েছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রামে বন্যায় প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে প্রায় ২৩ হাজার ৮০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। অনেক বাড়িতে এখনো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাণিজ্যিক মাছের ঘের ও পুকুর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে, যা উপকূলীয় মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সরকারি হিসাবে, বাঁশখালীর ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও বুকসমান পানি। সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে রয়েছে। ডলু খালের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। উপজেলাটিতে দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
রত্নপুর গ্রামের বাসিন্দা ছগির আহমেদ বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় পানি ওঠে, এটা নতুন নয়। কিন্তু এবার যেভাবে পুরো উপজেলা ডুবে গেছে, এমন বন্যা জীবনে দেখিনি।’
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওরস্যালাইন, শিশু খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নারী, শিশু, প্রবীণ ও গর্ভবতী নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১১৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি। তবে আগামী দুই দিনও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১০ জুলাই- এই ছয় দিনে চট্টগ্রামে মোট ১ হাজার ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এটি চট্টগ্রামের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড।
- বিষয় :
- চট্টগ্রাম
- শিশুর মৃত্যু
- বন্যা