মেয়ে পরীক্ষার্থী, বাবা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক
ফাইল ছবি
তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০১:২৪
শিক্ষা বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী, পরিবারের কেউ পরীক্ষার্থী হলে পরীক্ষা-সংক্রান্ত কোনো দায়িত্বেই থাকার কথা নয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার। কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্বে আছেন উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. আবু খায়ের মো. কামাল হাসান। তাঁর মেয়ে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী।
জানা গেছে, আগামী ২০ জুলাই চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। বর্তমানে বোর্ডের ভেতরে গোপনীয়তার সঙ্গে শেষ মুহূর্তের ফলাফল তৈরির কাজ চলছে জোরেশোরে। এমন এক সময়ে নিজের মেয়ে পরীক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও ড. কামাল হাসান ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্বে থাকায় ফলাফলের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চলতি বছরের ১০ জুন ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিলে এই পদটি ফাঁকা হয়। এর চার দিন পর উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. আবু খায়ের মো. কামাল হাসান তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক এস এম আরিফুর রহমানের কাছ থেকে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব বুঝে নেন। বোর্ডের ভেতরে-বাইরে কানাঘুষা চলছে তিনি নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে মেয়ের ফলাফল প্রক্রিয়ায় বিশেষ সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ড. কামাল হাসানের মেয়ে ময়মনসিংহ নগরীর প্রিমিয়ার আইডিয়াল হাই স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে এবার মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ২০২৬ সালের এসএসসির প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন, বিতরণের মতো অতিগোপনীয় ও সংবেদনশীল সময়েও তিনি ঢাকায় বিজি প্রেসে দীর্ঘদিন অবস্থান করে মূল দায়িত্ব পালন করেছেন।
বোর্ডের নিজস্ব ‘অফিসার্স অ্যান্ড এমপ্লয়িজ সার্ভিস রেগুলেশন’ এবং পরীক্ষা নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে– কোনো কর্মকর্তার নিকটাত্মীয় পরীক্ষার্থী হলে তিনি পরীক্ষা প্রক্রিয়া, গোপনীয়তা রক্ষা বা মূল্যায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। এমনকি পরীক্ষার আগে প্রত্যেক কর্মকর্তাকে ‘গোপনীয়তা ও নৈতিকতা সংক্রান্ত অঙ্গীকারনামা’ স্বাক্ষর করতে হয়, যেখানে পরিবারের কেউ পরীক্ষার্থী থাকলে তা লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সূত্রমতে, ড. কামাল হাসানের ক্ষেত্রে নীতিমালার সম্পূর্ণ ব্যত্যয় ঘটেছে। যা আইনগতভাবে গুরুতর অপরাধ।
বোর্ডের শীর্ষ পর্যায়ে এমন নিয়ম লঙ্ঘনের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। সম্প্রতি জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্রে ১০০ শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। গত ৪ জুলাই অনুষ্ঠিত এইচএসসি বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষায় একটি কক্ষে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের ২০২৬ সালের পরিমার্জিত সিলেবাসের পরিবর্তে ২০২৫ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়। শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক ভুলটি ধরিয়ে দিলেও কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তরা ধমক দিয়ে ভুল প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা দিতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রশ্নপত্র প্যাকেজিং ও বিতরণে বোর্ডের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও গাফিলতির কারণেই বিপর্যয় ঘটেছে। গত ২৪ জুন বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র আনার সময় ময়মনসিংহ বোর্ডের ৮ কর্মকর্তা ১৩ দিন ঢাকায় বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করেন। যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ। এই অতিরিক্ত কর্মকর্তাদের পেছনে দৈনিক ভাতা ও বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ৬-৭ লাখ টাকা তোলা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা। এ ছাড়া ঢাকা বোর্ডের দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকদের দিয়ে প্রশ্ন প্যাকেজিং করিয়ে যেখানে খরচ হওয়ার কথা তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা, সেখানে বোর্ডের নথিপত্রে প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।
এই নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়ে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্ব) অধ্যাপক এনামুল হকের ভাষ্য, পরিবারের কেউ পরীক্ষার্থী থাকলে পরীক্ষা সংক্রান্ত গোপনীয় শাখায় বা প্রধান দায়িত্বে থাকার কোনো সুযোগ নীতিমালায় নেই। ড. কামাল হাসানের মেয়ের এসএসসি পরীক্ষার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তিনি বলেন, এসএসসির প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণের সময় তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন না। তাই তখন কী হয়েছে তা বলতে পারবেন না। আর্থিক অনিয়ম হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. আবু খায়ের মো. কামাল হাসান আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, ‘আমার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, এটি সত্য। তবে আমি রুটিন দায়িত্ব পালন করছি মাত্র। ফলাফল পরিবর্তনের কোনো সুযোগ এখানে নেই। আমি যেসব দায়িত্ব পালন করেছি, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই করেছি। এসএসসি পরীক্ষায় আমার দায়িত্ব সীমিত ছিল। জামালপুরের ঘটনায় উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।’
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের ভাষ্য, ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. কামাল হাসান এসএসসির প্রশ্নপত্র প্যাকেজিংয়ের কাজে বিজি প্রেসে গিয়েছিলেন, এ কথা সত্য। ফলাফল প্রস্তুতির সময় তিনি গোপনীয় শাখার কোনো কাজ করতে পারবেন না। তাঁর সন্তান এসএসসি পরীক্ষার্থী এই মর্মে অফিস আদেশ তৈরি করে ফলাফল প্রস্তুত সংক্রান্ত কাজ থেকে অব্যাহতি নেওয়ার বিধান রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক সমকালকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার আগে জানা ছিল না। তবে এ রকম হয়ে থাকলে আগামীকালই (রোববার) ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’